Ajker Patrika

সাংবাদিক আলিফকে আগেও ‘হত্যাচেষ্টা’, খুনের দিন পোস্টে ‘গডফাদারের’ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ৪৪
সাংবাদিক আলিফকে আগেও ‘হত্যাচেষ্টা’, খুনের দিন পোস্টে ‘গডফাদারের’ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত
ছবি: ফাইল ছবি

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে এর আগেও একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার ও সহকর্মীরা। মাদক, চোরাচালান, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে লেখালেখির কারণে তাঁকে এসব হামলার শিকার হতে হয়েছিল বলে তাঁদের ভাষ্য। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে দুর্গাপুর পৌর শহরের উতরাইল বাজারে গুলি করে হত্যা করা হয় আলিফকে।

পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠায়। আজ শুক্রবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে কলমাকান্দায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

আগেও একাধিকবার হত্যাচেষ্টা

আলিফের ওপর এর আগেও হামলা হয়েছিল। গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করে। এর আগে গত বছরের ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়।

চ্যানেল ওয়ানের নেত্রকোনা প্রতিনিধি রানা আকন্দ বলেন, অনিয়ম ও অপরাধ তুলে ধরতে আপসহীন ছিলেন আলিফ। এর আগেও কয়েকবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। তবু তিনি দমে যাননি।

দৈনিক যায়যায়দিনের নেত্রকোনা প্রতিনিধি সোলাইমান হোসেন রুবেল বলেন, দুর্গাপুর-কলমাকান্দা এ দুটি সীমান্ত এলাকার মাদক, চোরাচালান, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম দুর্নীতি আলিফ তাঁর ফেসবুকে তুলে ধরতেন। এর আগেও কয়েকবার তাঁকে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে।

সোলাইমান হোসেন রুবেল বলেন, ‘গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর শহরে একবার আলিফকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। তখন ওই সময়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন পুলিশের একজন উপপরিদর্শক। আলিফের মাথায় চুল কম ছিল, ওই কর্মকর্তার মাথায়ও চুল কম ছিল। রাতে শহরের একটি পথ দিয়ে হেঁটে যান আলিফ। তার কয়েক মিনিট পর সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে। চেহারার মিল থাকার কারণে আলিফকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে গিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে ধারণা করেন অনেকে। আলিফ নিজেই আমাদের এসব বলেছে।’

শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, আলিফের শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। ময়নাতদন্তের সময় সেটি উদ্ধার করা হয়।

মৃত্যুর দিনও অপরাধের তথ্য প্রকাশের ঘোষণা

আলিফের ফেসবুক পোস্ট । ছবি: স্ক্রিনশট
আলিফের ফেসবুক পোস্ট । ছবি: স্ক্রিনশট

নিহত আলিফ ফকির রূপসী বাংলা টেলিভিশনের নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ (Detective Article) নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন।

আলিফের ওই পেজে দেখা যায়, তাঁর সর্বশেষ পোস্টগুলোর একটি ছিল, ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ...।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় পোস্টটি দেন তিনি। পরে রাতেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

দুই শিশুকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় স্ত্রী

আলিফের গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তিনি প্রায়ই ময়মনসিংহে থাকতেন। তবে এলাকায় এলে পাশের দুর্গাপুর উপজেলার তেলুঞ্জিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে দ্বিতীয় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার কাছে থাকতেন। আলিফের চার বছর বয়সী মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই শিশুকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন আনন্দিতা।

আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা জানান, একটি সংবাদের জেরে তাঁর স্বামীকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এর আগেও তাঁকে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছিল। আলিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পরীক্ষা করলেই এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, ‘লেখায় অনিয়ম-অপরাধ তুলে ধরায় স্থানীয়ভাবে তাঁর অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। অনেকবার তাঁকে সতর্কভাবে চলাফেরা করার পরামর্শ দিয়েছি। এলাকায় এলে আমাকে জানিয়ে রাখতে বলেছিলাম তাঁকে। যেন ওই এলাকায় একটু বাড়তি পুলিশি টহল দেওয়া যায়।’

ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি তাজা গুলি ও কয়েকটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। আলিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত