Ajker Patrika

আশুরার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যেসব ইতিহাস

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
আশুরার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যেসব ইতিহাস
ছবি: সংগৃহীত

ইসলামি বর্ষপঞ্জির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন হলো মহররমের ১০ তারিখ। যাকে ‘আশুরা’ বলা হয়। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস ও ঐতিহ্যে এ দিন বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব বহন করে। হাদিসে এ দিনের বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্যের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি তাফসির, ইতিহাস ও ফাজায়েলবিষয়ক গ্রন্থে আশুরার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনাও পাওয়া যায়। নিচে এ দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো।

আদম (আ.)-এর তওবা কবুল

হজরত আদম (আ.)-এর জীবনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো তাঁর তওবা কবুল হওয়ার ঘটনা। নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার পর তিনি ও হাওয়া (আ.) নিজেদের ভুল উপলব্ধি করে গভীর অনুশোচনায় আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাঁরা বলেন, ‘হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ (সুরা আরাফ: ২৩)। আশুরার দিন আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুল করেছিলেন। (ইবনে রজব হাম্বলি, লাতায়িফুল মাআরিফ, ১১৪, দারে ইবনে কাছির, বৈরুত, ১৯৯৯)

নুহ (আ.)-এর নৌকার নিরাপদ অবতরণ

হজরত নুহ (আ.) দীর্ঘদিন পর্যন্ত মানুষকে ইমানের দাওয়াত দেন। কিন্তু অল্পসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে তিনি একটি নৌকা নির্মাণ করেন এবং তাতে মুমিনদের আশ্রয় দেন। এরপর শুরু হয় মহাপ্লাবন। এতে সমগ্র অঞ্চল নিমজ্জিত হয়ে যায়।

দীর্ঘদিন পানির বুকে ভেসে থেকে আশুরার দিন নৌকাটি নিরাপদে জুদি পর্বতের ওপর এসে থামে। দীর্ঘ পরীক্ষা ও প্রতীক্ষার পর এটি ছিল আল্লাহর রহমত ও সাহায্যের অবিস্মরণীয় নিদর্শন। কঠিনতম সংকটের পরও আল্লাহ তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দেন। (ইবনে কাছির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১/১১৬-১১৭, মাকতাবাতুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৯৯০)

ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায়ের তওবা কবুল

হজরত ইউনুস (আ.) দীর্ঘদিন তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। কিন্তু তারা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করতে থাকে। তিনি তখন তাদের শাস্তির ভয় দেখিয়ে ভিন্ন এলাকায় চলে যান। সেখান থেকে চলে যাওয়ার একপর্যায়ে তিনি সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হন এবং একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলে।

এদিকে আল্লাহর শাস্তির আলামত প্রকাশ পেলে তাঁর সম্প্রদায় নিজেদের ভুল উপলব্ধি করে গভীর অনুতাপের সঙ্গে আল্লাহর কাছে তওবা করে এবং ইমান গ্রহণ করে। মহান আল্লাহ তাদের আন্তরিক তওবা কবুল করেন এবং তাদের ওপর থেকে শাস্তি প্রত্যাহার করে নেন। তাদের তওবা কবুলের এ ঘটনা আশুরার দিন সংঘটিত হয়েছিল। (ইবনে রজব হাম্বলি, লাতায়িফুল মাআরিফ, ১১৪, দারে ইবনে কাছির, বৈরুত, ১৯৯৯)

মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি

আশুরার দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ বর্ণনায় প্রমাণিত ঘটনা হলো নবী মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি। ফেরাউন ও তার বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বনি ইসরাইলের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন। ফেরাউনও তার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে। একপর্যায়ে সামনে সমুদ্র এবং পেছনে ফেরাউনের বিশাল সৈন্যবাহিনী—এমন সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে বনি ইসরাইল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

কিন্তু মুসা (আ.) দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘কখনো নয়, নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে আমার রব আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।’ (সুরা শুআরা: ৬২)। অতঃপর আল্লাহ সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করে তাঁদের জন্য নিরাপদ পথ উন্মুক্ত করে দেন। বনি ইসরাইল নিরাপদে পার হয়ে যায় এবং ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী সাগরে নিমজ্জিত হয়। এ ঘটনা আশুরাকে আল্লাহর সাহায্য, মুক্তি ও সত্যের চূড়ান্ত বিজয়ের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। (সহিহ্ বুখারি: ২০০৪)

কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা

আশুরার দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর অধ্যায় কারবালার ঘটনা। ৬১ হিজরির ১০ মহররম রাসুল (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবার ও অল্পসংখ্যক সঙ্গীকে নিয়ে কারবালার প্রান্তরে অবরুদ্ধ অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেন।

দীর্ঘ অবরোধ, পানির তীব্র সংকট এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপস করেননি। একে একে তাঁর পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীরা শাহাদাতবরণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনিও শাহাদাতের অমৃতপেয় পান করেন। কারবালার এ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে গভীর বেদনা, ধৈর্য, ত্যাগ, অবিচলতা এবং ইমানি দৃঢ়তার চিরস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। (ইবনে কাছির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৮/১৭২, মাকতাবাতুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৯৯২)

বর্ণনাগুলোর নির্ভরযোগ্যতা

উল্লেখ্য, আশুরার দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি এবং কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা নির্ভরযোগ্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সূত্রে প্রমাণিত।

পক্ষান্তরে আশুরার দিন আদম (আ.)-এর তওবা কবুল, নুহ (আ.)-এর নৌকার নিরাপদ অবতরণ এবং ইউনুস (আ.)-এর সম্প্রদায়ের তওবা কবুলের ঘটনাগুলো তাফসির, ইতিহাস ও ফাজায়েলবিষয়ক কিছু গ্রন্থে দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাই এগুলোকে অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করাই অধিক সতর্কতাপূর্ণ।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ি, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত