Ajker Patrika

নীতি ও আদর্শে রাসুল (সা.)-এর আপসহীন জীবন

মাহমুদ হাসান ফাহিম 
নীতি ও আদর্শে রাসুল (সা.)-এর আপসহীন জীবন

নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আজীবন এক আপসহীন ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র—যেকোনো চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি ও শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশেও তিনি কখনো নিজের স্থান থেকে তিল পরিমাণ বিচ্যুত হননি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধনীতি এবং মানবিক সুবিচারের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই নীতিপরায়ণতা বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সিরাত ও বিশুদ্ধ হাদিসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, শত্রুর চরম উসকানি কিংবা নিজের সেনাপতির অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল—কোনো কিছুই তাঁকে শরিয়তের মৌলিক নীতি ও সুবিচার থেকে সরাতে পারেনি। সিরাতের ইতিহাস থেকে এমন দুটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সেনাপতির ভুল ও অভূতপূর্ব ক্ষতিপূরণ

মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের দাওয়াত ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে সাহাবিদের ছোট ছোট কাফেলা প্রেরণ করেন। এরই অংশ হিসেবে হজরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল সাহাবিকে ‘বনি জুজাইমা’ গোত্রের নিকট পাঠানো হয়। এই কাফেলার উদ্দেশ্য যুদ্ধ নয়, বরং কেবল ইসলামের দাওয়াত দেওয়া।

বনি জুজাইমার লোকেরা আগে থেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু আরবি ভাষার প্রকাশভঙ্গির সীমাবদ্ধতার কারণে তারা ‘আসলামনা’ (আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি) সরাসরি না বলে বলছিল ‘সবা’না’ (আমরা স্ব-ধর্ম ত্যাগ করেছি)। সেনাপতি খালিদ (রা.) তাদের ভাষার এই পরিভাষাগত ভুলটি বুঝতে না পেরে মনে করলেন তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে তিনি আক্রমণ শুরু করেন এবং এতে বেশ কয়েকজন নিহত হন ও অনেককে বন্দী করা হয়। পরদিন খালিদ (রা.) বন্দীদের হত্যার নির্দেশ দিলে বেশ কয়েকজন সাহাবি ন্যায়নীতির খাতিরে তা পালনে অস্বীকৃতি জানান।

রাসুল (সা.)-এর তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিরল সুবিচার

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সংবাদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আসমানের দিকে হাত তুলে দুবার ঘোষণা করেন—‘হে আল্লাহ, খালিদ যা করেছে, আমি তার দায় থেকে মুক্ত।’ (সহিহ বুখারি: ৪৩৩৯, ৭১৮৯)

রাসুল (সা.) কেবল মুখে দায়মুক্তির কথা বলেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাৎক্ষণিকভাবে হজরত আলী (রা.)-কে পাঠিয়ে বনি জুজাইমা গোত্রের নিহতদের রক্তপণ (দিয়াত) এবং ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ-সম্পদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ শোধ করেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়। এমনকি ওই গোত্রের কুকুরের কাঠের তৈরি যে পানপাত্রগুলো ভাঙা পড়েছিল, মহানবী (সা.) তাও পরিশোধ করেছিলেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিইয়াহ: ৪ / ৭৩)

২. আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও দূত সুরক্ষার নীতি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ইয়ামামার বনু হানিফা গোত্রের মুসায়লামা নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি করে (ইতিহাসে সে ‘মুসায়লামা কাজ্জাব’ বা ঘোর মিথ্যাবাদী নামে পরিচিত)। সে রাসুল (সা.)-এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে দাবি করে যে সে নবুওয়াতের অংশীদার এবং আরব ভূমির অর্ধেক তার আর অর্ধেক কোরাইশদের হওয়া উচিত। (ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ: ৩ / ৫৩৪-৫৩৫)

চিঠিটি নিয়ে দুজন দূত রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়। চিঠির বক্তব্য শোনার পর মহানবী (সা.) দূতদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে আমি আল্লাহর রাসুল?’ তারা চরম ধৃষ্টতা দেখিয়ে বলল, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি মুসাইলামাই আল্লাহর রাসুল।’

উম্মতের জন্য নীতি ও সংযমের চিরন্তন শিক্ষা

সত্য নবীর দরবারে দাঁড়িয়ে এমন ভণ্ড মিথ্যাবাদীর নবুওয়াত স্বীকার করা ছিল ঘোর অপরাধ ও রাসুল (সা.)-এর সরাসরি অবমাননা। তৎকালীন প্রথা ও অপরাধের বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড হওয়া স্বাভাবিক থাকলেও, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নীতি ও ‘দূত হত্যা নিষিদ্ধ’ এই আদর্শে রাসুল (সা.) নিজেকে পূর্ণ সংযত রাখেন। তিনি বলেন, ‘শোনো, (আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী) দূত হত্যা নিষিদ্ধ। আল্লাহর কসম, আমি যদি কোনো দূতকে হত্যা করতাম, তবে অবশ্যই তোমাদের হত্যা করতাম।’ (মুসনাদু আবি দাউদ আত-তায়ালিসি: ২৪৮)

এরপর রাসুল (সা.) অত্যন্ত দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সেই অন্যায্য চিঠির জবাবে লেখেন, ‘পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ হতে ঘোর মিথ্যাবাদী মুসায়লামার প্রতি। সালাম তার প্রতি, যে হিদায়েতের অনুসরণ করে। পর সমাচার এই যে রাজ্য তো আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী করেন এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকিদের জন্য।’ (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিইয়াহ: ৪ / ২৪৩)

মানবজাতির জন্য চিরন্তন শিক্ষা

নবুওয়াতের সত্যতা রক্ষা কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট দেখানোর চেয়েও মহানবী (সা.)-এর কাছে নীতির প্রাধান্য ছিল সবার ওপরে। সেনাপতির অসতর্কতায় ঘটে যাওয়া ভুল মেনে না নিয়ে তিনি যেমন ক্ষতিপূরণ দিয়ে সুবিচারের দৃষ্টান্ত গড়েছেন, তেমনই চরম অপমানজনক পরিস্থিতিতেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার অক্ষুণ্ন রেখে দূতদের নিরাপত্তা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই আপসহীন ও নীতিমান আদর্শিক জীবন প্রতিটি মুসলিমের জন্য যেমন অনুসরণীয়, তেমনই আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা ও রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এক চিরন্তন ও দিকনির্দেশনামূলক শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত