Ajker Patrika

প্রতিদিন পড়া যায় যে ৮ নফল নামাজ

ইসলাম ডেস্ক 
প্রতিদিন পড়া যায় যে ৮ নফল নামাজ
প্রতীকী ছবি

নফল ইবাদত বান্দার আমলনামার সৌন্দর্য। নফল ইবাদতের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে আল্লাহ তাআলার অনেক কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়া যায় অনেক সহজে। মুমিন যখন ফরজ ও সুন্নতে মুআক্কাদা পালন শেষে নফল ইবাদতে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে—প্রতিটি রুকু-সেজদা এবং তাসবিহের বিনিময়ে তার মর্যাদা বাড়তে থাকে। সে আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী হতে থাকে। পাশাপাশি এই নফলগুলো তার আদায় করা ফরজের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটির কাফ্ফারাও হয়ে যায়।

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব হবে। হাদিসে তেমনটিই বর্ণিত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। (এখানে ফরজ নামাজগুলোর কথা বলা হয়েছে) যদি তা সঠিক হয়, তাহলে সে পরিত্রাণ পাবে। আর যদি খারাপ হয়, তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একই হাদিসে বর্ণিত, যদি তার ফরজের মধ্যে কিছু কম পড়ে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, ‘দেখ তো! আমার বান্দার নফল (ইবাদত) আছে কি না, যা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করা যায়।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৮৬৪)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, যার ফরজ যত ত্রুটিমুক্ত সে আল্লাহ তাআলার কাছে তত মকবুল। তাই ফরজগুলোকে ত্রুটিমুক্ত রাখতেও নফল ইবাদতের বিকল্প নেই।

১. তাহাজ্জুদের নামাজ

ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো তাহাজ্জুদ। শেষ রাতে আরামের ঘুম ভেঙে এই নামাজ পড়তে হয় বিধায় এর মর্যাদা যেমন অনেক বড়, সওয়াবও তেমন অনেক বেশি। তাহাজ্জুদের নামাজ সর্বনিম্ন ২ রাকাত থেকে সর্বোচ্চ ৮ বা ১২ রাকাত পড়ার কথা পাওয়া যায়। তবে এর থেকে বেশি পড়তে পারলে অবশ্যই তা প্রশংসনীয়।

পবিত্র কোরআনে তাহাজ্জুদ পড়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, (রাতের বেলা) তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং তারা নিজ প্রতিপালককে ভয় ও আশা (মিশ্রিত অনুভূতি) নিয়ে ডাকে। (সুরা সিজদা: ১৬) আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬৩)

২. ইশরাকের নামাজ

সূর্য পুরোপুরি উদিত হওয়ার পর যে নামাজ পড়া হয় তাকে ইশরাক বলে। ইশরাকের নামাজ ২ রাকাত থেকে ৪ রাকাত পর্যন্ত পড়ার কথা পাওয়া যায়।

হাদিসে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাজের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করতেন। দোয়া, তাসবিহ পাঠ ও দ্বীনি আলোচনায় এ সময়টা পার করতেন তিনি। পরে সূর্যোদয় হলে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন।

সাহাবিদেরও ইশরাক নামাজের প্রতি উৎসাহ দিতেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করল এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে বসে থাকল; অতঃপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করল, সে একটি পরিপূর্ণ হজ ও ওমরাহর সওয়াব পাবে।’ (সুনানে তিরমিজি: ৫৮৬)

৩. চাশত বা দুহার নামাজ

সূর্য মধ্যাকাশে স্থির হওয়ার আগ মুহূর্তে যে নামাজ পড়া হয় তাকে চাশত বলা হয়। পবিত্র কোরআনে এই নামাজকে দুহা নামে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকে ইশরাক এবং চাশতের নামাজকে একই নামাজ বলে থাকেন। তাদের মতে, সময়ের শুরুতে পড়লে ইশরাক এবং শেষ সময়ে পড়লে চাশতের নামাজ।

চাশতের নামাজের গুরুত্ব অনেক, ফজিলতও বিশাল। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘প্রিয়তম (রাসুল) আমাকে তিনটি বিষয়ে অসিয়ত করেছেন। বলে গেছেন, যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি তা ত্যাগ না করি। এক. প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, দুই. দুহা বা চাশতের নামাজ পড়া, তিন. ঘুমানোর আগে বিতর আদায় করা।’ (সহিহ বুখারি: ১১৮)

হজরত আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চাশতের ২ রাকাত নামাজ পড়বে সে উদাসীনদের তালিকাভুক্ত হবে না। যে ব্যক্তি ৪ রাকাত পড়বে সে ইবাদতগুজারি বান্দার তালিকাভুক্ত হবে। যে ব্যক্তি ৬ রাকাত পড়বে তা তার জন্য ওই দিনে (আল্লাহ তার অমঙ্গলের বিরুদ্ধে) যথেষ্ট হবে। যে ব্যক্তি ৮ রাকাত পড়বে আল্লাহ তাকে একান্ত অনুগতদের তালিকাভুক্ত করবেন। আর যে ব্যক্তি ১২ রাকাত পড়বে তার জন্য আল্লাহ জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।’ (তাবারানির কাবির, সহিহ তারগিব ৬৭১ নং)

৪. আউওয়াবিনের নামাজ

মাগরিবের ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর কমপক্ষে ৬ রাকাত নফল নামাজ পড়াকে আউওয়াবিন বলা হয়। তবে এশার ওয়াক্ত আসার আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় এই নামাজ পড়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, দুহার নামাজকে অনেকে আউওয়াবিন বলেছেন। নাম নিয়ে মতের ভিন্নতা থাকলেও এই সময়ের নামাজের গুরুত্ব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ৬ রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং এগুলোর মধ্যে কোনো মন্দ কথা বলল না, তাহলে তার আমলনামায় ১২ বছর ইবাদতের সওয়াব লেখা হবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১১৬৭)

৫. তাহিয়্যাতুল অজু

সুন্নত তরিকায় ভালোভাবে অজু করার পরেই ২ রাকাত নফল নামাজ পড়াকে তাহিয়্যাতুল অজু বলা হয়। তাহিয়্যাতুল অজু হলো অপবিত্র অবস্থা থেকে পবিত্র হতে পারার কৃতজ্ঞতার নামাজ। নামাজের নিষিদ্ধ সময় ছাড়া যেকোনো সময় তা পড়ার সুযোগ রয়েছে।

তাহিয়্যাতুল অজুর ফজিলত অনেক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করল এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দুই রাকাত নামাজ আদায় করল, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব।’ (সহিহ মুসলিম: ২৩৪)

৬. তাহিয়্যাতুল মসজিদ

নামাজ বা যেকোনো প্রয়োজনে মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে ২ রাকাত নামাজ পড়াকে তাহিয়্যাতুল মসজিদ বলা হয়। মসজিদে আসতে পারার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই নামাজ পড়া হয়। তাহিয়্যাতুল মসজিদও নামাজের নিষিদ্ধ সময় ছাড়া যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে এই নামাজ পড়তে গিয়ে কোনো ওয়াক্তের ফরজ বা সুন্নত মুআক্কাদা নামাজ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেই মুহূর্তে তাহিয়্যাতুল মসজিদ না পড়ে ওই সময়ের নির্ধারিত নামাজ পড়তে হবে।

হাদিসে বর্ণিত, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন দুই রাকাত নামাজ আদায় করার পর বসে।’ (সহিহ বুখারি: ১১৬৭)

৭. সালাতুল হাজাত

বিশেষ প্রয়োজন কিংবা সংকটকালে আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ পড়াকে সালাতুল হাজাত বা প্রয়োজনের নামাজ বলা হয়। নামাজের নিষিদ্ধ সময় ছাড়া যেকোনো সময় পড়া যায় এই বিশেষ নামাজ।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সালাতুল হাজত পড়ে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন।’ (সুনান তিরমিজি: ৪৭৮)

৮. তাওবার নামাজ

নামাজের সময় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। তাই কোনো গুনাহ হয়ে গেলে তওবার নিয়তে দুই রাকাত নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বেশি উত্তম। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা পাপ করে ফেলে, এরপর সে ভালোভাবে অজু করে এবং দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে। তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৫২১)

লেখক: ইমরান ওবাইদ, আলেম প্রাবন্ধিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত