Ajker Patrika

ক্ষমতার বড়াই যেভাবে ধ্বংস ডেকে আনে

তাসনিফ আবীদ
ক্ষমতার বড়াই যেভাবে ধ্বংস ডেকে আনে

মানুষকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। জ্ঞান, বিবেক ও নৈতিকতার মাধ্যমে মানুষ এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলেও তা টিকিয়ে রাখার একমাত্র শর্ত হলো বিনয়। অহংকার ও ক্ষমতার দম্ভ এমন এক মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের ইমান, চরিত্র এবং মানবিকতাকে কুরে কুরে খায়। কখনো কখনো এটি কেবল ব্যক্তিকে নয়, গোটা সমাজ ও সভ্যতাকেও ধ্বংসের অতল গহ্বরে তলিয়ে দিতে পারে।

অহংকারের স্বরূপ ও ইবলিস থেকে শিক্ষা

ইসলামের দৃষ্টিতে অহংকার মানে শুধু নিজেকে বড় মনে করা নয়; বরং প্রকৃত অহংকার হলো সত্যকে জেনেও তা প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম)। সৃষ্টির ইতিহাসে অহংকারের প্রথম শিকার হয়েছিল ইবলিস। আগুনের তৈরি হওয়ার বড়াই করে সে মাটির তৈরি আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল। এই আত্মম্ভরিতার কারণেই সে আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে বিতাড়িত হয়। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে অহংকার ধ্বংসের প্রথম ধাপ।

ইতিহাসের আয়নায় ধ্বংসপ্রাপ্তদের চিত্রক্ষমতা ও সম্পদের দম্ভে অন্ধ হয়ে অতীতে অনেক শক্তিশালী জাতি পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

  • আদ জাতি: তারা ছিল দীর্ঘকায় ও প্রচণ্ড শক্তিশালী। তাদের স্থাপত্যকলা ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে তারা আল্লাহকে ভুলে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়। নবী হুদ (আ.)-এর সতর্কবার্তাকে তারা তুচ্ছজ্ঞান করে। ফলস্বরূপ, টানা আট দিন সাত রাতের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে এই শক্তিশালী জাতি খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
  • সামুদ জাতি: পাহাড় কেটে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা নির্মাণে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। তাদের প্রাচুর্য যখন চরমে পৌঁছাল, তখন তারা আল্লাহর অবাধ্য হতে শুরু করল। নবী সালেহ (আ.)-এর অলৌকিক উষ্ট্রীকে হত্যা করার মাধ্যমে তারা তাদের ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। পরিণামে এক প্রচণ্ড বজ্রনিনাদে বা আকাশভেদী হুংকারে তারা সবাই জনশূন্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
  • ফেরাউন: ইতিহাসে অহংকার ও খোদাদ্রোহিতার সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ হলো ফেরাউন। সে ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ দেশ মিসরের একচ্ছত্র অধিপতি। নীল নদের অববাহিকায় তার ক্ষমতা ও প্রাচুর্য তাকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল যে সে নিজেকে ‘আনা রাব্বুকুমুল আলা’ অর্থাৎ ‘আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপালক’ বলে দাবি করে বসেছিল। তার এই সীমাহীন ঔদ্ধত্য শুধু মৌখিক দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; সে মানুষের ওপর অমানবিক জুলুম চালাত এবং নবজাতক পুত্রসন্তানদের নির্বিচারে হত্যা করত।
  • ফেরাউনের এই আত্মম্ভরিতা ও সত্য প্রত্যাখ্যানের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্তে সে ইমান আনার ব্যর্থ চেষ্টা করলেও আল্লাহ তাআলা তা গ্রহণ করেননি। বরং কিয়ামত পর্যন্ত আসা মানুষের জন্য তাকে এক বড় শিক্ষা হিসেবে রেখে দিয়েছেন। আজও মিসরের জাদুঘরে সংরক্ষিত তার নিথর দেহটি বিশ্ববাসীকে এই বার্তাই দেয় যে—পৃথিবীর কোনো সম্রাট বা পরাশক্তিই আল্লাহর শক্তির সামনে দাঁড়াতে পারে না। আর ক্ষমতার দম্ভ কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে।
  • নমরুদ: নমরুদ ছিল তৎকালীন পৃথিবীর প্রতাপশালী এক সম্রাট। ক্ষমতার মোহে সে নিজেকে উপাস্য দাবি করে বসেছিল এবং ইবরাহিম (আ.)-কে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। তার অহংকার এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে সে আকাশের অধিপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার স্পর্ধা দেখাত। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করতে কোনো বিশাল সেনাবাহিনী পাঠাননি; একটি ক্ষুদ্র ল্যাংড়া মশা তার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে দেন। সেই মশার কামড়ে মাথার যন্ত্রণায় সে অস্থির হয়ে নিজের মাথায় জুতো দিয়ে আঘাত করতে করতে অপমানজনকভাবে মৃত্যুবরণ করে। এটি প্রমাণ করে, আল্লাহর কাছে অহংকারী শাসকের শক্তি কতই-না নগণ্য।
  • আবু জাহেল: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল আবু জাহেল। সে জানত যে ইসলাম সত্য, কিন্তু নেতৃত্বের মোহ এবং গোত্রীয় আভিজাত্যের অহংকার তাকে সত্য গ্রহণে বাধা দিয়েছিল। সে নবীজি (সা.) এবং মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। বদরের যুদ্ধে নিজের বিশাল বাহিনীর অহংকারে সে দম্ভোক্তি করেছিল যে আজকের পর ইসলামকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে অত্যন্ত লাঞ্ছনাকরভাবে দুই কিশোর সাহাবির হাতে তার পতন ঘটে। আবু জাহেলের পরিণতি আমাদের শিক্ষা দেয় যে সত্যের সামনে অহংকারের জয় কোনো দিন স্থায়ী হয় না।

সমসাময়িক বিশ্ব ও ক্ষমতার দম্ভ

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতার দম্ভ আজও শান্তিকামী মানবতাকে পিষ্ট করছে। বড় পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যকামী নীতি, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর সামরিক আগ্রাসন এবং সম্পদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের নেশায় বিশ্ব আজ অস্থির। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা ক্ষমতা পেয়ে অহংকারের পথ বেছে নিয়েছে, তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ক্ষমতার বড়াই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু বিনয় ও ন্যায়ের পথ চিরস্থায়ী। তাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ও শান্তিময় করতে হলে ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দম্ভ পরিহার করে ইনসাফ ও বিনয়ের চর্চা অপরিহার্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জামুকা সংশোধনে বিল পাস, জামায়াতের আপত্তি, এনসিপির সমর্থন

নীরবতার চরম মূল্য: ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেভাবে হারিয়ে গেল উপসাগরীয় অঞ্চলে

নির্যাতনে স্ত্রীর আত্মহনন, স্বামী গ্রেপ্তার

ফুয়েল পাস অ্যাপ রেজিস্ট্রেশন ও ব্যবহার করবেন যেভাবে

ভূমি অধিগ্রহণের টাকা আত্মসাৎ: সাবেক কর্মকর্তাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত