Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

ভালো গবেষণা যেন দুর্বল ইংরেজিতে নষ্ট না হয়

ভালো গবেষণা যেন দুর্বল ইংরেজিতে নষ্ট না হয়

দেশে-বিদেশে গবেষণার চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। একাডেমিক ক্যারিয়ার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে জার্নাল পেপার প্রকাশ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গবেষণার বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে উপযুক্ত জার্নাল বাছাই, সাবমিশন প্রক্রিয়া এবং রিজেকশন মোকাবিলা—এই পুরো প্রক্রিয়া অনেক গবেষকের কাছেই জটিল একটা। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনিরুল ইসলাম

জার্নাল পেপার সম্পর্কে জানতে চাই।

সাধারণত আমরা গবেষণার ফলাফল প্রকাশের জন্য বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করি। এর মধ্যে সবচেয়ে বহুল পরিচিত এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাধ্যম হলো একাডেমিক জার্নাল। জার্নাল পেপার বলতে বোঝায়, যেখানে একজন গবেষক তাঁর গবেষণার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ফলাফল এবং বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক বা স্বীকৃত কোনো একাডেমিক জার্নালে প্রকাশ করেন। এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টির একটি আনুষ্ঠানিক মাধ্যম। প্রত্যেকটি জার্নালের পেপার প্রকাশের জন্য নিজস্ব নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও গাইডলাইন থাকে। একাডেমিক বিশ্বে ওয়েব অব সায়েন্স (Web of Science) এবং স্কোপাস (Scopus) ইনডেক্সভুক্ত জার্নালে প্রকাশিত পেপারের গ্রহণযোগ্যতা সর্বাধিক।

কেন গবেষণা পেপার জার্নালে প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষকের গবেষণা জার্নালে প্রকাশের মাধ্যমে স্বীকৃতি ও বৈধতা পায়। তবে শর্ত হলো, সেটি অবশ্যই পিয়ার রিভিউড হতে হবে। জার্নাল প্রকাশনার মাধ্যমে গবেষকের একাডেমিক পরিচিতি গড়ে ওঠে। জ্ঞান সৃষ্টির ধারায় তিনি যুক্ত হন। একই সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ার উন্নয়নের পথ সুগম হয়। গবেষণা পেপার প্রকাশ রিসার্চ প্রজেক্ট, স্কলারশিপ, প্রমোশন ও ফান্ডিংয়ের সুযোগ বাড়ায়। গবেষণার পরিধি অনুযায়ী নিজ দেশের গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরারও সুযোগ সৃষ্টি করে।

একটি ভালো গবেষণার বিষয় কীভাবে নির্বাচন করা উচিত?

গবেষণার বিষয় নির্বাচন একটি জটিল প্রক্রিয়া। সহজভাবে বলতে গেলে, একটি ভালো গবেষণার বিষয় হতে হবে গবেষণাযোগ্য, সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক। একই বিষয়ে পূর্ববর্তী গবেষণায় যেসব ঘাটতি বা গবেষণাগত ফাঁক রয়ে গেছে সেসব বিষয় হবে প্রধান কেন্দ্র। পাশাপাশি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটার প্রাপ্যতা ও অ্যাকসেস থাকতে হবে। শুধু বিষয়টি ‘ইন্টারেস্টিং’ হলেই চলবে না; গবেষণায় অবশ্যই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক অবদান থাকতে হবে।

উপযুক্ত জার্নাল নির্বাচন করার প্রক্রিয়াটা কী?

অনেক সময় দেখা যায়, গবেষণার বিষয়বস্তু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও শুধু জার্নাল নির্বাচন ও সাবমিশন জটিলতার কারণে গবেষকেরা পেপার সাবমিট করতে আগ্রহ হারান। প্রথমেই গবেষণাপত্রের থিম ও ডিসিপ্লিন নির্ধারণ করতে হবে। এরপর স্কোপাস, ওয়েব অব সায়েন্স, ABDC, CABS, ERIM ও CNKI তালিকা পর্যালোচনা করা উচিত। সংশ্লিষ্ট জার্নালের Aims & Scope ভালোভাবে পড়তে হবে। সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রবন্ধের সঙ্গে নিজের গবেষণার মিল যাচাই করতে হবে। শুধু CiteScore বা Impact Factor নয়, বরং জার্নালের সঙ্গে গবেষণার ‘ফিট’ ও সামগ্রিক মানে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রেডেটরি জার্নাল এড়িয়ে চলা জরুরি। ওপেন অ্যাকসেস কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জার্নালও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।

একটি জার্নাল পেপারের প্রধান অংশগুলো কী কী?

এটি অনেকাংশে নির্ভর করে গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট জার্নালের গাইডলাইনের ওপর। তবে অধিকাংশ জার্নাল পেপারে কিছু নির্দিষ্ট অংশ সাধারণভাবে অনুসরণ করা হয়। একটি স্ট্যান্ডার্ড জার্নাল পেপারে সাধারণত Title, Abstract, Keywords, Introduction, Literature Review, Methodology, Results/Findings, Discussion, Conclusion, Ethical Consideration এবং References থাকে।

এই কাঠামো গবেষণার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। বিশ্বের অধিকাংশ স্বীকৃত জার্নালেই এই অংশগুলো বিদ্যমান।

জার্নাল পেপার সাবমিট করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া কেমন?

একবার যদি জার্নাল পেপার সাবমিশনের প্রক্রিয়াটি ভালোভাবে রপ্ত করা যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে আর তেমন জটিলতায় পড়তে হয় না। প্রথমে জার্নালের Author Guidelines অনুযায়ী পেপার ফরম্যাট করতে হবে। এরপর ScholarOne, Manuscript Central, Editorial Manager বা OJS–এর মতো সাবমিশন সিস্টেমে অ্যাকাউন্ট খুলে নিজের এবং কো-অথরদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়। সঙ্গে Cover Letter এবং Declaration বা Ethics Statement সংযুক্ত করে পেপার সাবমিট করতে হয়। এরপর Editor Screening, Peer Review, Revision এবং সবশেষে Acceptance অথবা Rejection আসে। পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হলেও, জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেল হাতে পাওয়ার আনন্দে এই কষ্ট অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।

পেপার রিজেক্ট হওয়ার সাধারণ কারণ কী?

পেপার রিজেক্ট হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এটা গবেষণা ও গবেষকভেদে ভিন্ন হয়। তবে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মাত্রার সিমিলারিটি বা এআই-নির্ভর লেখা, জার্নালের স্কোপের সঙ্গে গবেষণার অমিল, দুর্বল থিওরি বা মেথডোলজি, নতুনত্বের অভাব, দুর্বল ইংরেজি এবং অসংগঠিত উপস্থাপন। পাশাপাশি রিভিউয়ারদের মন্তব্য যথাযথভাবে সংশোধন না করাও রিজেকশনের একটি বড় কারণ। এ ছাড়া জার্নালের নির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুসরণ না করেও অনেক পেপার বাতিল হয়ে যায়।

ইংরেজি ভাষাগত দুর্বলতা থাকলে কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়?

ইংরেজি মূলত একটি যোগাযোগের ভাষা। অনেক জার্নাল নির্দিষ্ট ভাষাগত কাঠামো অনুসরণ করেই পেপার প্রকাশ করে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত ভাষা হওয়ায় অধিকাংশ গবেষণা ইংরেজিতেই প্রকাশিত হয়। যাঁরা ইংরেজিতে দুর্বল মনে করেন, তাঁদের জন্য পরামর্শ হলো সহজ ও পরিষ্কার ইংরেজিতে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভালো গবেষণা যেন দুর্বল ইংরেজির কারণে নষ্ট না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। নিয়মিত ভালো মানের জার্নাল পেপার পড়া, Grammarly, StealthWriter, QuillBot ও DeepL-এর মতো টুল ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সাবমিশনের আগে পেশাদার ভাষা সম্পাদনার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

দেশি গবেষকদের জন্য কোন জার্নালগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সহায়ক?

SAGE, Wiley & Sons, Emerald, Taylor & Francis, Inderscience এবং Springer Nature-এর কিছু Q2 ও Q3 জার্নালগুলো দেশি গবেষকদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া Heliyon, Humanities & Social Sciences Communications, এশিয়াভিত্তিক স্কোপাস ইনডেক্সড জার্নাল এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জার্নালও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। ওপেন অ্যাকসেস বা ক্লোজড অ্যাকসেস যাই হোক না কেন, DOI (Digital Object Identifier) থাকলে সেই জার্নালে পেপার সাবমিট করা নিরাপদ।

নতুন গবেষকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

নতুন গবেষকদের জন্য পরামর্শের শেষ নেই। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে ধৈর্য ধরতে হবে। রিজেকশনকে ভয় পাওয়া যাবে না। কারণ, রিজেকশন একাডেমিক জীবনেরই অংশ। অভিজ্ঞ মেন্টরের সঙ্গে কাজ করা, নিয়মিত লেখালেখি করা এবং গবেষণায় নৈতিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখতে হবে, একটি ভালো পেপার লেখা কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর শুরু আছে, শেষ নেই। কিন্তু এর ফল অত্যন্ত মধুর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পুতুলকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য: বিএনপির প্রবীণ নেতা বহিষ্কার

পাকিস্তান বিশ্বকাপ বর্জন করলে বাংলাদেশকে ডাকতে পারে আইসিসি

ইরানের কাছে পৌঁছেছে ভেনেজুয়েলার চেয়েও বড় ‘আর্মাডা’, সমঝোতা চায় ইরান: ট্রাম্প

পথসভায় কেঁদেকেটে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ভোট চাইলেন যুবদল নেতা, পেলেন শোকজ

পিঠা উৎসবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দিকে একের পর এক ডিম নিক্ষেপ, ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান কর্মীদের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত