Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, ভারতকে বদলাতে হবে: নাহিদ ইসলাম

বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, ভারতকে বদলাতে হবে: নাহিদ ইসলাম

গণ-অভ্যুত্থানে সামনের সারির নেতৃত্ব থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে জায়গা করে নিয়েছিলেন মো. নাহিদ ইসলাম। এরপর উপদেষ্টার পদ ছেড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার ও রাজনৈতিক দল গঠন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট ছাড়াও আলোচিত বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপির অবস্থান ও ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থা নিয়ে আজকের পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন নাহিদ ইসলাম। দীর্ঘ আলাপচারিতার অনুলিপি করেছেন অর্চি হক

আজকের পত্রিকা: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) নির্বাচনী জোটে যাওয়ার রসায়নটা হলো কী করে?

নাহিদ ইসলাম: আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এনসিপি ওই সময়টা পায়নি, যে সময়টায় সাংগঠনিকভাবে বিস্তৃতি বা সক্ষমতা তৈরি করে এককভাবে নির্বাচন করতে পারবে। সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের কাছে মনে হয়েছে, একটা বৃহত্তর জোট দরকার। একটা তো হচ্ছে আমাদের সংসদে অংশগ্রহণ, আরেকটা হচ্ছে যেহেতু এবারের সংসদ সংস্কার পরিষদ হবে এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নের কথা; সেখানে আমাদের ভয়েসটা থাকা জরুরি এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও এনসিপির এই ইলেকটোরাল পলিটিকসে ঢোকা এবং অর্জন করা জরুরি। ওই জায়গায় মনে হয়েছে যে—একটা বড় শক্তির সঙ্গে আমাদের একটা নির্বাচনী জোট প্রয়োজন।

আজকের পত্রিকা: জামায়াতের আদর্শের সঙ্গে এনসিপির আদর্শের কোনো মিল বা অমিল আছে?

নাহিদ ইসলাম: জামায়াত একটা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। তাদের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এনসিপি একটা মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল, যার স্বপ্ন একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ফলে এই জায়গায় আসলে খুব মিলের জায়গাটা নেই। তবে জামায়াতের সঙ্গে আমাদের ইস্যুভিত্তিক মিল রয়েছে। সংস্কার প্রশ্নে, আধিপত্যবাদবিরোধিতা প্রশ্নে ও দুর্নীতি প্রশ্নে আমরা জামায়াতকে আমাদের বেশি কাছাকাছি মনে করছি, বিএনপির তুলনায়।

আজকের পত্রিকা: বিএনপির সঙ্গেও তো আপনাদের নির্বাচনী সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল। সেটা ভেস্তে গেল কেন?

নাহিদ ইসলাম: এগোলো না, কারণ আমাদের কাছে মনে হয়নি যে বিএনপি আসলে কোনো জোট করতে চাচ্ছে। কারণ, বিএনপির যেটা জোট বলা হচ্ছে, সেটা কিন্তু আসলে কোনো জোট না। এটা মূলত বিএনপিই। আর কিছু দলকে কিছু আসন দেওয়া হয়েছে। আপনি দেখবেন যে, অনেকগুলো দল তাদের নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করেছে। অর্থাৎ বহুদলীয় গণতন্ত্রের যেটা বিএনপির ভিত্তি, এবার তারা সেটার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, বিএনপি পুরোনো যে সিস্টেম, পুরোনো ব্যবস্থাপনা—সেটাকেই টিকিয়ে রেখে নিজে ক্ষমতায় যেতে চাচ্ছে। এ ছাড়া আসনের বিষয়—এগুলো তো খুবই ‘প্র্যাকটিক্যাল ইস্যু’। এগুলোতেও আলোচনাটা এগোয়নি।

আজকের পত্রিকা: এনসিপির একটি বিরাট অংশ জামায়াতের সঙ্গে যাওয়ার বিরুদ্ধে ছিল। বিশেষ করে, নারী নেতাদের কেউ কেউ তো ঘোষণা দিয়েই দল ছেড়েছেন বা নির্বাচনে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কি দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়নি যে দল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?

নাহিদ ইসলাম: আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে মেজরিটি আসলে সিদ্ধান্তের পক্ষেই থেকেছে। নারীদের একটা অংশ এই সিদ্ধান্তের পক্ষে থেকেছে। হয়তো আমাদের যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ নারী নেতা, তাঁরা অনেকেই এটার বিরোধিতা করেছেন। ঢালাওভাবে যেভাবে বলা হচ্ছে যে নারীরা সবাই বিরোধিতা করেছেন, বিষয়টা কিন্তু এ রকম না। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে নারী ইস্যু না। নারীকে মুখোমুখি করাটা ঠিক না বলে আমি মনে করি। এই আলোচনা আমাদের পার্টি ফোরামে অনেক দিন ধরেই চলমান ছিল। যে জোটে গেলে এনসিপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে এবং দেশ সামগ্রিকভাবে লাভবান হবে, সেভাবে আমরা জোট বেছে নিই। শেষ পর্যন্ত আমরা জামায়াতকে বেছে নিয়েছি।

আজকের পত্রিকা: আগে জামায়াতের স্লোগান ছিল ‘আল্লাহর আইন চাই’। তারা সেটা যদি বাস্তবায়ন করে, এনসিপিও কি সেই পথে যাবে?

নাহিদ ইসলাম: এবারের নির্বাচনে এই প্রতিশ্রুতি তারা (জামায়াত) দিচ্ছে না। এবারের নির্বাচন বা এবারের সরকার গঠনপ্রক্রিয়া তাদের এই ধর্মীয় প্রকল্পের অংশ নয়। তারা একটা কল্যাণ রাষ্ট্র চাচ্ছে। আমরাও একটা কল্যাণ রাষ্ট্র চাচ্ছি। আমরাও তো নতুন সংবিধান চাই। তাই বলে কি আমরা এবার ইলেকশন বা এই সংবিধান যতটুক চেঞ্জ হয়েছে, এটা কি আমরা মেনে নিচ্ছি না? জামায়াতের একটা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হয়তো আছে।

আজকের পত্রিকা: শোনা গেছে যে, জামায়াতের সঙ্গে আপনাদের সমঝোতায় সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা ছিলেন, এটা কি ঠিক?

নাহিদ ইসলাম: না, একদম না। সরকারের সঙ্গে অন্য দলগুলোর যে সম্পর্ক, আমাদেরও তা-ই।

আজকের পত্রিকা: জুলাই অভ্যুত্থানের পর আপনারাই সরকার গঠন করলেন। সরকারপ্রধান কে হবেন, তা-ও ঠিক করে দিলেন। তারপরও সরকারের সঙ্গে আপনাদের এত দূরত্ব হলো কেন?

নাহিদ ইসলাম: দেখুন, আমরা ৮ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছি। ৮ আগস্টের পরেও কিছুদিন করেছি। যখন এই সরকার গঠিত হয়ে যায়, তখন কিন্তু ছাত্রদের সবাই সরকারের অংশ হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদ এককভাবে ছাত্ররা করেছে, এটাও সত্য না। আমরা বিএনপি, জামায়াত বা আরও যে শক্তিগুলো ছিল, আমাদের এই অভ্যুত্থানে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ও সুপারিশ নিয়ে করেছি। কিন্তু যখন সরকার গঠিত হয়ে যায় এবং তার প্রধান হন ড. ইউনূস, আমরা কিন্তু আমাদের সমস্ত নেতৃত্ব ও দায়িত্ব ইউনূস এবং ইউনূসের নেতৃত্বে সরকারকে দিয়ে এসেছি। ফলে বাকিটা এই সরকারের দায়িত্ব। উপদেষ্টা পরিষদে আরও বিভিন্ন দলের সুপারিশে আসা লোকেরা রয়েছেন। আমাদের জায়গা থেকে আমরা বিভিন্ন জিনিস বলার চেষ্টা করেছি। তারপর বের হয়ে আসার পর সামগ্রিকভাবেই আমাদের ফারাক হয়ে গেছে। আর যখন আমরা রাজনৈতিক দল আকারে আত্মপ্রকাশ করি, তখন রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব—সরকারের সমালোচনা করা।

আজকের পত্রিকা: সরকারের কাজে আপনারা প্রকাশ্যে অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন।

নাহিদ ইসলাম: একটা সরকার কেবল এনসিপির সব কথা শুনবে, এটাও ঠিক না। ফলে সরকার তিন দলকে ভারসাম্য করেই তার নীতি বা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার বিভিন্ন ভুল করেছে, আমরা সেটা সমালোচনা করেছি। জুলাই সনদ যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে, স্বাক্ষরিত হয়েছে, জুলাই সনদ আদেশ যেটা হয়েছে—প্রতিটা জায়গায় আমরা সমালোচনা করেছি। সরকার তিন দলকে ভারসাম্য করতে গিয়ে একটা শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি।

আজকের পত্রিকা: দেশের পুলিশ বাহিনী এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঠিক নেই। এটাকে কীভাবে দেখেন?

নাহিদ ইসলাম: সরকারের এসব জায়গায় অনেক ব্যর্থতা রয়েছে। ব্যর্থতাগুলো আমরা বলেছি। একটা সরকার চালানোর জন্য যে রাজনৈতিক শক্তি বা সমর্থন দরকার, সেটা সরকার ব্যাপকভাবে পায়নি। যদি প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিত, তাহলে এই সরকার এটা চালাতে পারত। এই ভারসাম্য করতে গিয়ে বিভিন্ন তদবির, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নানান চাপের মুখে সরকার আসলে তার কাজটা করতে পারেনি।

আজকের পত্রিকা: এখন কি বলতে পারবেন, আপনাদের পছন্দগুলো ঠিক ছিল?

নাহিদ ইসলাম: আমাদের পছন্দ (সিলেকশন) এখন তো বলব—হয়তো সম্পূর্ণ ঠিক ছিল না। ড. ইউনূসকে সিলেক্ট (পছন্দ) করা অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এর কোনো বিকল্প ছিল না। পরের সিদ্ধান্তগুলো আসলে ড. ইউনূসই নিয়েছিলেন। আমরা চেয়েছিলাম জাতীয় সরকার। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোকে অনবোর্ড করা যায়নি, তখন আমাদের বাকি রইল শুধু নাগরিক সমাজের কিছু লোকজন। আমরা তাদেরই তখন প্রস্তাব দিয়েছি।

আজকের পত্রিকা: এনসিপির সঙ্গে দেশের সেনাবাহিনীর একটা দূরত্ব রয়েছে, এটা মোটামুটি ‘ওপেন’। এটাকে কীভাবে দেখেন?

নাহিদ ইসলাম: আমি মনে করি না প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এনসিপির কোনো দূরত্ব আছে। আমরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীকে যথাযথ সম্মান করি। গুরুত্বপূর্ণ মনে করি রাষ্ট্রের জন্য। আমরা বাংলাদেশের প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের কিছু সংস্কারের কথা বলেছি। স্বাভাবিকভাবে সেনাবাহিনীও এর অন্তর্গত। গত ১৬ বছর সেনাবাহিনীকেও রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন নেতা সেটা বিভিন্ন সময় বলার চেষ্টা করেছে। আমরা মনে করেছি, আমাদের দায়িত্ব ছিল এই বিষয়গুলো জনসম্মুখে বলার। এতটুকুই। বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা নই। অন্য যেকোনো দলের চেয়ে আমি মনে করি, সেনাবাহিনীর যে অংশটা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে—সেনারা, তরুণ অফিসারেরা, তাদের সঙ্গে আমাদের একটা নৈকট্য আছে আন্দোলনের জায়গা থেকে। আমার একটা ছবিও আছে যে একজন সেনা আমাকে কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। ফলে আমরা যখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলি, তাঁদের ভেতরে সেই আকাঙ্ক্ষাটা দেখি—দেশ পরিবর্তনের।

আজকের পত্রিকা: ভারত বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কটা কীভাবে দেখেন?

নাহিদ ইসলাম: আমি মনে করি, বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ আত্মমর্যাদা নিয়ে কথা বলতে শিখছে। এটাকে আমি বৈরী হিসেবে দেখি না। বরং মনে করি, বাংলাদেশের এভাবেই এগোনো উচিত। এখন ভারতকে বাংলাদেশ নিয়ে নীতি পরিবর্তন করতে হবে। বিগত ১৬ বছর যে সম্পর্ক ছিল, সেটা ছিল একপক্ষীয়। এই সম্পর্ক ছিল দাসত্বমূলক। আমি যদি কারও সঙ্গে সমানে সমানে কথা বলতে চাই, সে যদি আমার প্রতি বৈরী হয়, এটা তার বিষয়। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমি আমার স্বার্থের পক্ষেই কথা বলব।

আজকের পত্রিকা: নির্বাচন তো একটা বিরাট খরচের ব্যাপার। এনসিপির নেতারা এত টাকা কোথায় পাবেন? কীভাবে নির্বাচন করবেন?

নাহিদ ইসলাম: আমরা ক্রাউডফান্ডিং (গণচাঁদা/অনুদান) কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু করেছি। আমাদের বিভিন্ন নেতা ব্যক্তিগতভাবে অনলাইনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। যেহেতু সামাজিক মাধ্যমে আমাদের একটা ভালো উপস্থিতি আছে, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রাউডফান্ডিং শুরু করেছি ওয়েবসাইটভিত্তিক। তারপর আমাদের বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে আমরা চাচ্ছি। এখন জোট হওয়ার কারণে আমরা হয়তো একটা আর্থিক সাপোর্টও বিভিন্ন জায়গায় পাচ্ছি।

আপনি দেখবেন, আমাদের প্রচারণা ভিন্ন রকমের। আমরা পায়ে হেঁটে নিজেরাই ‘ডোর টু ডোর’ (দ্বারে দ্বারে) মানুষের কাছে যাচ্ছি, কথা বলছি। আমরা বড় প্রোগ্রাম বা শোডাউন যত কম করা যায়, সেটা দেখছি। আমরা প্রচারণার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনছি। এটার একটা বড় কারণ মূলত আর্থিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আমরা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।

আজকের পত্রিকা: আপনারা ভোটারের কাছে গিয়ে কী কথা বলছেন?

নাহিদ ইসলাম: প্রথমত, আমরা পরিবর্তনের কথা বলছি। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে যে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে, যদি সুযোগ পাই, এটাকে অব্যাহত রাখব। আমাদের স্লোগান ছিল—সমাজের বৈষম্য কমিয়ে আনা এবং দুর্নীতি বন্ধ করা। এলাকায় এলাকায় যখন আমরা যাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি যে—চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব মানুষের প্রধান সমস্যা হয়ে উঠছে। আমরা যে রাজনীতিটা করতে চাই, সেই রাজনীতি চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বকে প্রশ্রয় দেবে না। আরেকটা বড় বিষয় হচ্ছে, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানো, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা, সংস্কারপ্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখা—এই বিষয়গুলোই আমরা মানুষকে বলছি।

আজকের পত্রিকা: আপনি কি মনে করেন, ভোটাররা আপনাদের এসব কথা শুনছে?

নাহিদ ইসলাম: আমরা যেখানেই যাচ্ছি, খুবই ভালো সাড়া পাচ্ছি। মানুষ দুইটা ভাগ দেখতে চায়—পরিবর্তনের পক্ষে কারা আর পরিবর্তনের বিপক্ষে কারা। আওয়ামী লীগ চলে গেছে, কিন্তু চাঁদাবাজিটা অন্য কেউ করছে। এই ব্যবস্থা কারা টিকিয়ে রাখতে চায় আর কারা পরিবর্তন করতে চায়। আমি মনে করি, মানুষ সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার জায়গাটাতে তরুণদের নেতৃত্ব হিসেবে এনসিপিকে দেখছে।

আজকের পত্রিকা: যদি ‘না’ ভোট জয়যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবেন, আপনাদের কোনো প্রস্তুতি আছে?

নাহিদ ইসলাম: আমরা মনে করি না যে ‘না’ ভোট জয়ী হবে। ‘না’ ভোট জয়ী হলেও যে অভ্যুত্থান একদম ব্যর্থ হয়ে যাবে, তা নয়। হয়তো পুরোনো ব্যবস্থাটাই থাকবে। তার মানে মানুষকে আমরা হয়তো বোঝাতে সক্ষম হইনি, মানুষের কাছে হয়তো এই বার্তা সম্পূর্ণভাবে পৌঁছায়নি—এটাই ধরে নিতে হবে। মানুষের কাছে আবার যেতে হবে। বোঝাতে হবে যে—পরিবর্তনগুলো কেন প্রয়োজন। আমি মনে করি যে, এটা ইতিমধ্যে চলে এসেছে এবং এই নির্বাচনে এটার ফলাফল আসবে।

আজকের পত্রিকা: আপনি তো সরকারে ছিলেন। পুরো রাষ্ট্রকাঠামো আমলাতান্ত্রিক, এই অবস্থার কি আদৌ পরিবর্তন সম্ভব?

নাহিদ ইসলাম: আমি মনে করি, অবশ্যই সম্ভব। সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস না করলে তো আর রাজনীতি করতাম না।

আজকের পত্রিকা: আপনারা কেমন রাষ্ট্র চান?

নাহিদ ইসলাম: আমরা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই। যেখানে আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী থাকবে। যেটা নাগরিক অধিকার, মৌলিক অধিকারগুলোকে সুরক্ষা দেবে। দ্বিতীয়ত, আমরা চাই, একটা কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, যেটা অর্থনৈতিক ন্যায় নিশ্চিত করবে, সমাজের বৈষম্য কমিয়ে আনবে। এই দুইটাই এবারের নির্বাচনে আমাদের প্রধানতম অ্যাজেন্ডা।

আজকের পত্রিকা: নতুন বন্দোবস্ত যদি কোনোভাবেই সম্ভব না হয়, তাহলে এত মানুষের প্রাণের দায়টা কে নেবে?

নাহিদ ইসলাম: এর দায় তো এনসিপি অবশ্যই নেবে। এনসিপি যেহেতু এই স্লোগান দিয়েছে। এই আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বলেই মানুষকে রাজপথে এনেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তো এই আন্দোলনে বিএনপি, জামায়াতসহ আরও অনেকগুলো অংশ ছিল। তাদের ওপরও সমানভাবে এর দায় বর্তাবে।

আজকের পত্রিকা: আপনাদের কথায় ভরসা করে যারা রাস্তায় নেমেছিল, তারা কি আপনাদের ক্ষমা করবে?

নাহিদ ইসলাম: আওয়ামী লীগ, যেই দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, যারা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ঘোষণা দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে; সেই দল যখন সেই আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীতে হেঁটেছে, তার পরিণতি কী হয়েছে? জনগণ তার বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে দাঁড়িয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কোনো কিছুই কিন্তু কাজ করেনি। ফলে এটাই পরিণতি। যারাই জন-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, যারাই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবে, যারাই লুটপাটের ও গুম-খুনের রাজনীতি করবে, তাদের পরিণতি এটাই হবে।

আজকের পত্রিকা: আপনি কি মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে না গিয়ে বিএনপির সঙ্গে গেলে ভালো হতো?

নাহিদ ইসলাম: আমার মনে হয়, আরও যত দিন যাবে, এটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে—বিএনপির সঙ্গে যাওয়াটা আসলে একেবারেই উচিত হতো না।

আজকের পত্রিকা: আপনি এর আগে বলেছিলেন, কয়েকজন উপদেষ্টা ‘সেফ এক্সিট’ নিতে কাজ করছেন। তাঁরা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেন বলে মনে করেন, যেটা এনসিপির জন্য ক্ষতিকর হবে?

নাহিদ ইসলাম: আমি মনে করি, উপদেষ্টা পরিষদে এমন কেউ কেউ আছেন, যাঁরা হয়তো নিরপেক্ষ থাকবেন না। আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, তাঁরা জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে কাজ করেছেন। আমি নাম না নিলেও তাঁদের প্রতি সেই সতর্কবাণীটা করেছি। তাঁরা যদি সে রকম কিছু করার চেষ্টা করেন, এর পরিণতিটা ভালো হবে না।

আজকের পত্রিকা: আপনাদের দলের সাবেক কয়েকজন নেতা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন। আরও কয়েকজন সাবেক নেতা নতুন একাধিক প্ল্যাটফর্ম আনবেন বলে শোনা যাচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

নাহিদ ইসলাম: খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। জুলাইয়ে যাঁরা যুক্ত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকগুলো প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে। আমি তো দেখি—ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে আগামী ১০-১৫ বছর পরে আমাদের প্রজন্ম আরও পরিণত হবে রাজনীতিতে। তখন দেখা যাবে, সবাই আসলে কোনো না কোনোভাবে বৈষম্যবিরোধী বা নাগরিক কমিটিতে ছিলেন। এটা আসলে খারাপ না যে আমাদের প্রজন্মই রাজনীতিতে থাকবে। হয়তো এই প্ল্যাটফর্ম পছন্দ না হলে আরেকটা প্ল্যাটফর্ম করবে।

আজকের পত্রিকা: এনসিপির বয়স এক বছরও হয়নি। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে।

নাহিদ ইসলাম: আমরা মনে করি, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের যুক্ত হওয়া, পদত্যাগ করা, বহিষ্কার করা—এগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমাদের দলের যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, প্রমাণ এসেছে, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি, সে যত গুরুত্বপূর্ণ পদেই থাকুক না কেন। এটা নতুন দল, এখানে নানান জায়গা থেকে নানান মানুষ যুক্ত হয়েছে, অনেকে অনেক অ্যাজেন্ডা নিয়ে হয়তো যুক্ত হয়েছে, সেটা পরিশুদ্ধ হতে একটা সময়ের প্রয়োজন।

আজকের পত্রিকা: একটা কথা আছে যে, এনসিপি শুধু শহরের তরুণদের সংগঠন। গ্রামের তরুণেরা এনসিপির সঙ্গে কম সম্পৃক্ত। এটা কি ঠিক?

নাহিদ ইসলাম: যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছে, এটার তো একটা বাস্তবতা আছে। আমরা তো আসলে সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক। গ্রামের তরুণদের কাছে আমাদের মেসেজ (বার্তা) আমরা পৌঁছাতে পেরেছি বলে মনে করি। কিন্তু সাংগঠনিক বিস্তৃতি আমাদের এখনো গ্রামপর্যায় পর্যন্ত যায়নি। হয়তো এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা যোগাযোগ হবে। নির্বাচনের পরে আমরা এই উদ্যোগ নেব।

আজকের পত্রিকা: এনসিপিকে অনেকে কিংস পার্টি বলেন। এই সরকারের বিদায়ের পরে সামনে যদি আপনাদের জোট ক্ষমতায় না আসে, তাহলে আপনারা কি এই গতিতে এগোতে পারবেন, যেমনটা গত দেড় বছরে পেরেছেন?

নাহিদ ইসলাম: এই সময়টাকে আমাদের বুঝতে হবে, এ সময় কোনো বিরোধী দল বলে কিছু নেই। এটা একটা ‘ফেভারেবল টাইম’। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি—সবাই সরকারের ‘ব্লেসিং’ পেয়েছে। সরকারবিরোধী দল যে রকম দমন-পীড়নের মধ্যে থাকে, অসহযোগিতার মধ্যে থাকে, আমরা চাই না বাংলাদেশে সেটা আরও হোক। সবাই শুধু বলছে, এনসিপি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু বিএনপিও তো একইভাবে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, জামায়াতও পেয়েছে বিভিন্ন সময়। আমরা আদালতে দেখতে পাচ্ছি, কীভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিএনপির কোনো এক প্রার্থীর বিরুদ্ধে এক রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউএনও মনে হয় একটা ব্যবস্থা নিয়েছে, তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে যে, রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, শক্তি প্রয়োগ করে বিএনপি প্রশাসনকে একদিকে, তাদের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারেক রহমান দেশে আসার পর তাঁকে যে প্রটোকল দেওয়া হয়েছে বা তাঁর পরিবার যে প্রটোকল পাচ্ছে, এটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আমাদের ‘ভাই-ব্রাদার’ কেউই প্রশাসন, জুডিশিয়ারি—কোথাও নেই।

আজকের পত্রিকা: আপনার চোখে গত এক বছরে এনসিপির কী কী ভুল ছিল?

নাহিদ ইসলাম: এনসিপির আরও আগেই এনসিপি হওয়া উচিত ছিল; এনসিপি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা উচিত ছিল। এনসিপির নির্বাচনী রাজনীতিতে আরও আগেই মনোনিবেশ করা উচিত ছিল। এটা যেহেতু বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া একটা শক্তি, একটা দ্বিধা অনেক দিন ধরে ছিল—এটা বিপ্লবের পথে যাবে নাকি নির্বাচনের পথে যাবে!

আজকের পত্রিকা: আপনাকে ধন্যবাদ।

নাহিদ ইসলাম: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পুতুলকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য: বিএনপির প্রবীণ নেতা বহিষ্কার

পাকিস্তান বিশ্বকাপ বর্জন করলে বাংলাদেশকে ডাকতে পারে আইসিসি

ইরানের কাছে পৌঁছেছে ভেনেজুয়েলার চেয়েও বড় ‘আর্মাডা’, সমঝোতা চায় ইরান: ট্রাম্প

পথসভায় কেঁদেকেটে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ভোট চাইলেন যুবদল নেতা, পেলেন শোকজ

পিঠা উৎসবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দিকে একের পর এক ডিম নিক্ষেপ, ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান কর্মীদের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত