Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

গবেষণা ফান্ড পাওয়ার বেশ কিছু উৎস আছে

গবেষণা ফান্ড পাওয়ার বেশ কিছু উৎস আছে

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একজন শিক্ষার্থীর নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার হলো গবেষণা। আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থাকলেও অনেক সময় সঠিক নির্দেশনার অভাবে তাঁরা পিছিয়ে পড়েন। গবেষণা কী, কেন এটি জরুরি এবং কীভাবে শুরু করা যায়—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. প্রধান মাহবুব ইবনে সিরাজ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবিদ আনজুম ত্রিদিব

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮: ২৮

গবেষণা সম্পর্কে বলুন।

গবেষণা হলো কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বা কোনো সমস্যার সমাধান বের করা। ধরা যাক, আপনি জানতে চান ‘অনলাইন ক্লাসে কি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিন দিন কমছে?’ এ প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর পেতে আপনাকে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। যেমন: প্রথমে তথ্য সংগ্রহ, সেই তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং শেষে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বা ফলাফল তৈরি করা। এই পুরো প্রক্রিয়া হলো গবেষণা। এটি কেবল বিজ্ঞানীদের জন্য নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানী প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্যই প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারে গবেষণার ভূমিকা কতটা?

গবেষণা করার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর যেকোনো বিষয়ের ওপর গভীর জ্ঞান অর্জিত হয়। এটি তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তা, গঠনমূলক লেখালেখি এবং সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিদেশে পড়াশোনায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের এটি বিশেষ সহায়ক। কোনো শিক্ষার্থীর প্রকাশিত গবেষণাপত্র থাকলে সেটি তাঁকে অন্যদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখে। এ ছাড়া পেশাগত জীবনেও গবেষণার অভিজ্ঞতা কর্মদক্ষতা উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

বর্তমান যুগে গবেষণার সহায়ক টুলস বা প্রযুক্তিগুলো কী কী?

এই যুগে এসে গবেষণা অনেক সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর। বিভিন্ন ধাপে আমরা ভিন্ন ভিন্ন টুলস ব্যবহার করতে পারি। যেমন: তথ্য খোঁজার জন্য গুগল স্কলার বা রিসার্চগেট; তথ্যসূত্র বা রেফারেন্সিংয়ের জন্য মেন্ডেলি বা অ্যান্ডনোট; লেখালেখির জন্য এমএস ওয়ার্ড বা গুগল ডকস; উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য এসপিএসএস বা এক্সেল; চৌর্যবৃত্তি বা নকল যাচাইয়ের জন্য টারনিটিন; উপস্থাপনার জন্য পাওয়ারপয়েন্ট, ক্যানভা বা গুগল স্লাইডস ব্যবহার করতে পারি। এ ছাড়া অনলাইন সেমিনার বা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের জন্য জুম বা মাইক্রোসফট টিমস এখন অপরিহার্য। এসব টুলস ব্যবহার জানলে গবেষণার প্রতি আগ্রহ ও কাজের মান দুটোই বাড়ে।

গবেষণায় প্রযুক্তি কেন ব্যবহার করা দরকার?

বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর যুগ। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের কাজকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করে তুলেছে। গবেষণার ক্ষেত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। আগে গবেষণা করতে গেলে গবেষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে বসে বই ঘাঁটতে হতো। প্রয়োজনীয় একটি তথ্য খুঁজে পেতে অনেক সময় একাধিক বই পড়তে হতো। কখনো কখনো একটি বইয়ের জন্য অন্য লাইব্রেরি বা এমনকি অন্য দেশেও যেতে হতো। ফলে গবেষণা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য একটি প্রক্রিয়া।

কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এখন গবেষণার পদ্ধতিতে বিপ্লব এসেছে। ইন্টারনেট, অনলাইন জার্নাল, ই-বুক, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন গবেষণাভিত্তিক সফটওয়্যার গবেষকদের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ডেটা অ্যানালাইসিস, গ্রাফ তৈরি, রেফারেন্স ম্যানেজমেন্ট এবং প্লেজিয়ারিজম যাচাই—সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা প্রযুক্তি রয়েছে, যা গবেষণার মান আরও উন্নত করে এবং ফলাফলকে নির্ভরযোগ্য করে তোলে।

গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ডিং বা স্কলারশিপের সুযোগ সম্পর্কে জানতে চাই।

গবেষণার জন্য অর্থের জোগান বা ফান্ডিং পাওয়ার বেশ কিছু উৎস আছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ‘রিসার্চ গ্রান্ট’ বা গবেষণা মঞ্জুরি থাকে। এ ছাড়া ইউজিসি নিয়মিত গবেষণার জন্য অনুদান দেয়, যার তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায়। স্কলারশিপের ক্ষেত্রে জার্মানির ড্যাড, ইউরোপের ইরাসমাস মুন্ডাস বা কমনওয়েলথ স্কলারশিপ অন্যতম। ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিও বা সংস্থাও গবেষণার সুযোগ দেয়। তাদের ওয়েবসাইটগুলো নিয়মিত অনুসরণ করলে এসব সুযোগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আসা প্রয়োজন?

প্রথমেই আমাদের প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের ‘প্রজেক্ট বেজড লার্নিং’ বা প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষায় উৎসাহিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়কেই গবেষণার জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন এনে

যদি গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গবেষণায় আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে।

যারা নতুন শুরু করতে চায়, তাদের জন্য কী পরামর্শ থাকবে?

আপনাকে আপনার পছন্দের বা আগ্রহের বিষয়টি খুঁজে বের করতে হবে। এরপর সে বিষয় নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন জার্নাল আর্টিকেল বা বই পড়তে হবে। ছোট পরিসরে কাজ শুরু করতে হবে। গবেষণার মূল ভিত্তি বা হাইপোথিসিস ঠিক হয়ে গেলে গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নিতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একজন মেন্টর বা সঠিক পরামর্শদাতা খুঁজে বের করা। তিনি হতে পারেন আপনার শিক্ষক বা অভিজ্ঞ কোনো বড় ভাইবোন। মেন্টরের দিকনির্দেশনা থাকলে গবেষণার পথ অনেক সহজ

হয়ে যায়। পাশাপাশি নিয়মিত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, গবেষণা খুব কঠিন কিছু নয়; ধৈর্য আর সঠিক দক্ষতা বা স্কিল ডেভেলপ করতে পারলে, যে কেউ এতে আত্মবিশ্বাসী হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত