Ajker Patrika

দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান /গোপন তথ্যে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশু যৌন পাচারের গোমর ফাঁস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২০: ২৬
গোপন তথ্যে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশু যৌন পাচারের গোমর ফাঁস
গত বছর সিনেট কমিটির শুনানিতে মেটা-র প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। ছবি: এএফপি

একটি গোপন সূত্র থেকে পাওয়া একটি তথ্য—সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল অনুসন্ধান। আর সেই অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা-এর বহু মিলিয়ন ডলারের আইনি পরাজয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) এই অনুসন্ধানের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’।

২০২১ সালের কথা। কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইনে মানুষের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ঠিক সেই সময়েই সাংবাদিকদের কাছে আসে এক ভয়াবহ তথ্য—যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের যৌন পাচার দ্রুত বাড়ছে এবং অপরাধীরা এই কাজে ব্যবহার করছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম-এর মতো জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম।

এই তথ্যের ভিত্তিতে মানবাধিকার সাংবাদিক মে-লিং ম্যাকনামারার সঙ্গে যৌথভাবে একটি গভীর অনুসন্ধান শুরু হয়। শুরুতেই বিভিন্ন পাচারবিরোধী সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, অপরাধীরা সামাজিক মাধ্যমের অপ্রকাশ্য অংশ—যেমন মেসেঞ্জার বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট—ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের টার্গেট করছে। প্রথমে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে, পরে তাদের যৌন শোষণের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনে শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যৌন কর্মকাণ্ডে সম্মতির প্রশ্নই ওঠে না। ফলে কোনো শিশুকে ব্যবহার করে যৌন বাণিজ্য চালানো বা সেই থেকে লাভবান হওয়া—সবই মানবপাচারের শামিল।

এই অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ ছিল অত্যন্ত কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতের নথি সংরক্ষণকারী ডেটাবেইস ‘পেসার’-এ সরাসরি অনুসন্ধান সুবিধা নেই এবং অনেক মামলার নথি গোপন রাখা হয়। তাই সাংবাদিকদের বিচার বিভাগের প্রেস রিলিজ ঘেঁটে সম্ভাব্য মামলাগুলো খুঁজে বের করতে হয়। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য ও প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করা হয়।

এই অনুসন্ধানে উঠে আসে ভয়াবহ চিত্র। ফেসবুক মেসেঞ্জারে কিশোরীদের ‘বিক্রি’ নিয়ে দর কষাকষির ট্রান্সক্রিপ্ট পাওয়া যায়। ইনস্টাগ্রামের ‘স্টোরিজ’ ফিচারে পাচারের শিকার শিশুদের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল। অর্থ লেনদেন ও লজিস্টিকসের বিষয়ও সেখানে আলোচনা হতো। অথচ এসব অপরাধের কোনোটি মেটা-র পক্ষ থেকে শনাক্ত বা প্রতিরোধ করা হয়নি।

সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট মডারেটর হিসেবে কাজ করা সাবেক কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হয়। তাঁরা জানান, প্রতিদিন ভয়াবহ কনটেন্ট দেখতে দেখতে তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু শিশু পাচারের মতো গুরুতর বিষয়গুলো রিপোর্ট করলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হতো না। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার ক্ষেত্রে মেটার মানদণ্ড ছিল খুবই সীমিত।

২০২২ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ‘কান্ট্রিজ হাউস’ নামের একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যান সাংবাদিকেরা। এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন পাচার থেকে বেঁচে ফেরা টিনা ফ্রান্ডট। সেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হয়—কীভাবে কিশোরীদের টার্গেট করা হয়, কীভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের বিক্রি করা হয়।

সেই আলোচনায় উঠে আসে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর গল্প, যার ছদ্মনাম দেওয়া হয় ‘মায়া’। ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ওই ব্যক্তি তাকে মাদক মিশ্রিত পদার্থ দেয়। সেদিন রাতেই সে ঘুমিয়ে পড়ে—আর কোনো দিন জেগে ওঠেনি।

অন্য এক অনুসন্ধানে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের এক প্রসিকিউটরের দপ্তরে গিয়ে জানা যায়, সামাজিক মাধ্যমে শিশু পাচারের ঘটনা প্রতি বছর প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। মহামারির সময় শিশুরা বাড়িতে থেকে অনলাইনে বেশি সময় কাটানোয় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অপরাধীরা সহজেই অনলাইনে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের চিহ্নিত করতে পারছে।

একজন প্রসিকিউটর বলেন, ‘এটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে। এখন সবকিছু অনলাইনে—যোগাযোগ, লেনদেন, সবকিছুই নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হচ্ছে।’ এমনকি একজন কারাবন্দি পাচারকারীও জানান, অপরাধের জন্য তার সবচেয়ে পছন্দের প্ল্যাটফর্ম ছিল ইনস্টাগ্রাম।

এই অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। শুরুতে এর প্রভাব স্পষ্ট না হলেও পরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন, যেখানে অভিযোগ করা হয়—তাদের প্ল্যাটফর্ম শিশু শিকারিদের জন্য এক ধরনের বাজারে পরিণত হয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে সেই মামলার রায়ে মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। যদিও প্রতিষ্ঠানটি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে এবং দাবি করেছে, তারা কিশোরদের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তবে বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মেসেঞ্জার ও মেটা পে ব্যবহার করে শিশুদের যৌন নির্যাতনের উপকরণ কেনাবেচা করা হচ্ছিল। এ ছাড়া টেক্সাসের কিশোরী ক্রিস্টেন গ্যালভানের ঘটনাও উঠে আসে, যিনি ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে পাচারের শিকার হন এবং পরে নিহত হন।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মেসেঞ্জারে এনক্রিপশন চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতে অপরাধ শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। যদিও মেটা বলেছে, ব্যবহারকারীরা নিজেরাই অভিযোগ জানাতে পারবেন। কিন্তু আদালতে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি স্বীকার করেন, ব্যবহারকারীর অভিযোগের চেয়ে কোম্পানির নিজস্ব প্রযুক্তি অনেক বেশি কার্যকর।

সব মিলিয়ে এই অনুসন্ধান স্পষ্ট করে দেয়—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, তার অপব্যবহার ঠেকাতে ব্যর্থ হলে তা ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন আরও কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি এবং কার্যকর নীতিমালার দাবি উঠছে বিশ্বজুড়ে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত