ইরান যুদ্ধই কাল হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির কাছে নাস্তানাবুদ হলো রিপাবলিকান পার্টি। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুটোরই নিয়ন্ত্রণ গেল ডেমোক্র্যাটদের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নির্বাচনের মধ্যে লাল রং মুছে গেছে নীলের ঢেউয়ে। ফেডারেল সরকারের তহবিল ছাড়, আইন পাস—সব ক্ষেত্রেই বাধা হয়ে উঠবেন ডেমোক্র্যাটরা। ফলে পদে পদে বাধার মুখে পড়তে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ফলাফলে দেখা গেছে, সিনেটের ৫৪টি আসন জিততে চলেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। আর রিপাবলিকানদের হাতে যাচ্ছে ৪৪টি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য সিনেটে ১০০টি আসনের মধ্যে ৫১টি আসনে জয়ের প্রয়োজন হয়। সেই হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকছে উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ।
একই চিত্র নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের। এই কক্ষের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ২১৮টি আসনের প্রয়োজন হয় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে ২২৮টি আসন জিততে চলেছে। বিপরীতে ১৩৯টি আসনে জয়ের পথে রয়েছে রিপাবলিকানরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, কারণ ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। আর এর জবাব এসেছে ভোটে। এই নির্বাচনের পর দেশ পরিচালনায় পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হতে পারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
যে কারণে ডেমোক্র্যাটদের জয়
ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন জনগণ একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন; তাঁরা এমন রাজনীতি চান, যা মানুষকে বিভক্ত না করে বরং ঐক্যবদ্ধ করে এবং এমন নেতৃত্ব চান, যাঁরা তাঁদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর সুনির্দিষ্ট সমাধান দিতে পারেন।
এই জয়ের জন্য ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের দায় তিনি নিতে চাননি। তাঁর মতে, তিনি ব্যালট পেপারে ছিলেন না বলেই এই শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে।
যদিও ফক্স নিউজের সঙ্গে আলাপকালে ভিন্ন কথা বলেছেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে এবারের নির্বাচনে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, তবে এবারের নির্বাচনে ইরান যুদ্ধ ছাড়াও মার্কিনদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছিল। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে যেসব জরিপ প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোতে তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার রাতে ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর আক্রমণাত্মক মনোভাব, বিশৃঙ্খলায় ভরা দ্বিতীয় মেয়াদের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
যা হতে পারে
এই নির্বাচনের পর আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধাক্কা খেতে পারে ট্রাম্প। কারণ তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি কোনো কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি। ফলে পদে পদে বাধার মুখে পড়বেন তিনি।
ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের পর ট্রাম্প পরিবারের বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের পদক্ষেপগুলো নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হতে পারে। এমনকি এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের চেষ্টাও করতে পারেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ব্যাপক তদন্ত শুরু করতে পারেন এবং তাঁদের এমন পরিকল্পনাও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শরণার্থী ও অভিবাসী প্রত্যাবাসন নীতির আওতায় মার্কিন কর সংস্থা (আইআরএস) এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মধ্যকার সহযোগিতাপূর্ণ কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে ডেমোক্র্যাটরা তাঁদের নতুন সমন জারি করতে পারেন।
যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধার মুখে পড়তে পারে ট্রাম্প। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা এখন রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন ফেডারেল আদালতের বিচারক পদে প্রেসিডেন্টের মিত্রদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবে।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নিয়ন্ত্রণও পায়, যে কমিটিগুলোর তদন্ত শুরু করার, সরকারি নথিপত্র তলব করার এবং সাক্ষীদের হাজির করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে। এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্ট বা সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা সফলভাবে অভিশংসিত হলে, তার বিচার পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে সিনেটের ওপর; যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পদ থেকে অপসারণও করা হতে পারে।
প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমে কোনো বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগে তা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই পাস হতে হয়। এ ক্ষেত্রে চাইলেই ট্রাম্পের পছন্দের যেকোনো আইন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে ডেমোক্র্যাটদের।
তবে ডেমোক্র্যাটদের নিজস্ব আইনি অ্যাজেন্ডা সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বাধা রয়েছে।
আবার উভয় দলের সমর্থন থাকা উদ্যোগগুলোও—যেমন ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি—ট্রাম্পের ভেটো অতিক্রম করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্প বাগড়া দিলে সেগুলো আটকে যেতে পারে। এই ইঙ্গিত অবশ্য ইতিমধ্যে তিনি দিয়েছেন। সোমবার একটি পডকাস্টে বলেছেন, ‘আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব।’
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস তাদের সাংবিধানিক তদন্তের ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করবে। তিনি আল জাজিরাকে এক ই-মেইলে বলেন, ‘আপনি ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় এবং আগ্রাসী ভূমিকা দেখতে পাবেন।’









