মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৮৪ মিলিয়ন ব্যয় ইহুদি লবি আইপ্যাকের, ৫৫ মিলিয়নই জলে

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম) ৮৪ মিলিয়ন ডলার বা ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছে ইহুদিপন্থী প্রভাবশালী লবি সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)। তবে সংগঠনটির ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই গেছে পরাজিত প্রার্থীদের পেছনে। নির্বাচনে আইপ্যাকের সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (সুপার প্যাক) ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংগঠন প্রায় ৫৫ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীদের জেতাতে পারেনি। রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইপ্যাকের সবচেয়ে বড় ব্যয় ছিল মিশিগানে ডেমোক্র্যাট সিনেটর-ইলেক্ট আবদুল এল-সাইয়েদকে পরাজিত করার প্রচেষ্টায়। তাঁকে ঠেকাতে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করে সংগঠনটি।
নির্বাচনের এই ফলাফল গত কয়েক বছরের মধ্যে আইপ্যাকের অন্যতম বড় নির্বাচনী ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং এর ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
এর আগে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আইপ্যাকের সুপার প্যাক ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্টের ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ এমন নির্বাচনী লড়াইয়ে খরচ হয়েছিল, যেখানে সংগঠনটির সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। ২০২৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই হার আরও বেড়ে ৮৭ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, সে বছর আইপ্যাকের ব্যয়ের বড় অংশই সফল প্রার্থীদের পেছনে গিয়েছিল।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে নিজের বিজয় ভাষণে আইপ্যাকের বিরুদ্ধে সরাসরি বক্তব্য দেন আবদুল এল-সাইয়েদ। তিনি জানান, তাঁকে পরাজিত করতে আইপ্যাক ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ব্যয়ের তুলনায় তাঁর দেওয়া এই অঙ্ক বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ছোট আকারের অন্যান্য সুপার প্যাকের অতিরিক্ত অর্থসহায়তাও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।
বিজয় ভাষণে এল-সাইয়েদ বলেন, ‘আইপ্যাক, আমাদের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আপনাদের দুবার পরাজিত করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে তাঁকে পরাজিত করার জন্য আইপ্যাকের আগের প্রচেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ইসরায়েলের নীতির সমালোচক ড্যানিয়েল বিসকেও পরাজিত করার চেষ্টা চালায় আইপ্যাক। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ইভানস্টনের সাবেক মেয়র বিস হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের নাতি। চলতি বছরের শুরুতে ইলিনয়ের ৯ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে জয়ী হন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে আইপ্যাক প্রায় ৬০ লাখ ডলার ব্যয় করলেও শেষ পর্যন্ত জয় ঠেকাতে পারেনি। মঙ্গলবার রাতের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট-অধ্যুষিত ওই আসনে সহজেই জয় পান বিস।
তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে পরাজিত হলেও মার্কিন রাজনীতিতে আইপ্যাকের প্রভাব একেবারে কমে যায়নি।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নিজেদের বিজয়ী দাবি করে আইপ্যাক জানায়, সংগঠনটির সদস্যদের সমর্থন পাওয়া ২৩৪ জনেরও বেশি প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তবে কোন কোন আসনের কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি সংগঠনটি। উল্লেখ্য, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কয়েক হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ডিসিতে আইপ্যাক এখনো একটি প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষের ডেমোক্র্যাটিক নেতারাই আইপ্যাকের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থসহায়তা পেয়েছেন। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি সিনেটে ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার এবং প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফরিসকে তাঁদের নিজ নিজ দলের উল্লেখযোগ্য বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে।
অন্যদিকে, আইপ্যাকের বিরোধীরা মঙ্গলবারের নির্বাচনী ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। ওয়াশিংটনে আইপ্যাকের প্রভাব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘আইপ্যাক ট্র্যাকার’ এমন ৩০ জন কংগ্রেস সদস্যের তালিকা প্রকাশ করেছে, যাঁরা আইপ্যাকের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক বা সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
এদিকে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বুধবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণেই রিপাবলিকানরা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। আইপ্যাক এই যুদ্ধকে সমর্থন করেছিল। পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।









