Ajker Patrika

পোলিও-হামের টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা যাবে না: মার্কিন টিকা কমিটির প্রধান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
পোলিও-হামের টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা যাবে না: মার্কিন টিকা কমিটির প্রধান
ট্রাম্প প্রশাসনের তৈরি করা অ্যাডভাইজরি কমিটি অন ইমিউনাইজেশন প্র্যাকটিসেস (এসিআইপি)-এর প্রধান শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কির্ক মিলহোয়ান। ছবি: এয়ার ফোর্স

দুরারোগ্য ব্যাধিগুলোর টিকা আবিষ্কার করতে দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। টিকা নেওয়ার ফলে অনেকেই রক্ষা পেয়েছেন বড় বড় রোগ থেকে, ফিরে এসেছেন মৃত্যুর মুখ থেকে। তবে টিকা বা ভ্যাকসিন নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের টিকা–সংক্রান্ত ফেডারেল প্যানেলের চেয়ারম্যান ডা. কির্ক মিলহোয়ান একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের তৈরি করা অ্যাডভাইজরি কমিটি অন ইমিউনাইজেশন প্র্যাকটিসেস (এসিআইপি)-এর নেতৃত্বদানকারী শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কির্ক মিলহোয়ান বলেছেন, টিকা নেবে কি নেবে না এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে ব্যক্তির অধিকারকে সংক্রামক রোগে অসুস্থতা বা মৃত্যুর আশঙ্কার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ডা. মিলহোয়ান বলেন, পোলিও ও হাম, এমনকি সব রোগের বিরুদ্ধেই টিকা ঐচ্ছিক হওয়া উচিত এবং কেবল একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে তা দেওয়া উচিত। তবে টিকা না নেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে কিছু শিশু হামে মারা যেতে পারে বা পোলিওতে পঙ্গু হতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি। তারপর বলেন, ‘মানুষ যখন মদ্যপানজনিত রোগে মারা যায় তখনও আমি দুঃখিত হই। এটা পছন্দের স্বাধীনতার কারণে খারাপ স্বাস্থ্যগত পরিণতি।’

সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির টিকা নিতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত, অন্যদেরও প্রভাবিত করতে পারে। এক্ষেত্রে ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে সেসব শিশু যাদের বয়স এখনো টিকা নেওয়ার মতো হয়নি বা যারা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন নয়। তবে এসব ঝুঁকির চেয়েও টিকা প্রত্যাখ্যান করার ব্যক্তিগত অধিকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন ডা. মিলহোয়ান।

তিনি বলেন, “যদি কোনো পছন্দের সুযোগ না থাকে, তাহলে ‘ইনফর্মড কনসেন্ট’ কেবল একটি ভ্রান্ত ধারণা। সম্মতি ছাড়া এটি এক প্রকার ‘মেডিক্যাল ব্যাটারি’ (অনুমতিহীন শারীরিক হস্তক্ষেপ)। ”

পোলিও ও হামের টিকা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। এগুলোর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পঙ্গুত্ব এবং লাখো মানুষের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে পোলিও টিকার শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সমর্থন রয়েছে, যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও রয়েছেন, যারা টিকা আবিষ্কারের আগের ভয়াবহ সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

তবে ডা. মিলহোয়ান মনে করেন, বর্তমানে যেভাবে সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে টিকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তার পরিবর্তে টিকাকে ঐচ্ছিক করলে শেষ পর্যন্ত জনস্বাস্থ্যের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

অনেক বিশেষজ্ঞ ডা. মিলহোয়ানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলছেন, তিনি যে ধরনের টিকানীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব দিচ্ছেন, তা বাস্তবায়িত হলে শিশু মৃত্যু বেড়ে যাবে এবং যা ‘অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু’ বলা যায়।

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের সংক্রামক রোগ কমিটির চেয়ারম্যান ডক্টর শন ও’লেরি বলেন, ‘তিনি কী বলছেন, সে সম্পর্কে তাঁর নিজেরই কোনো ধারণা নেই। এই টিকাগুলো শিশুদের সুরক্ষা দেয় এবং জীবন বাঁচায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মতো যারা শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে কাজ করে যাচ্ছি, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত হতাশান বিষয় যে বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তিহীন এক আদর্শগত এজেন্ডার কারণে শিশুদের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’

ডা. মিলহোয়ান গত বৃহস্পতিবার প্রচারিত ‘হোয়াই শুড আই ট্রাস্ট ইউ?’ নামের একটি পডকাস্টে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। ওই পডকাস্টে তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পোলিও ও হাম আগের মতো হুমকি নয়, আর এটি কেবল ভ্যাকসিনের কারণে নয় বরং চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশনের উন্নতির কারণে হয়েছে। তাঁর এই বক্তব্য স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের মন্তব্যেরই প্রতিধ্বনি।

তিনি নিজেকে টিকার ঝুঁকি নিয়ে ‘পর্দা সরিয়ে দেখানো’ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন।

পডকাস্টে দেওয়া এই বক্তব্যে পর বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার পরবর্তীতে বেশ কিছু টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে তিনি তার এই মত আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তির ইচ্ছাই গুরুত্ব পাওয়া উচিত। টিকা–বিষয়ক কমিটি অবশ্য সব টিকাকে ঐচ্ছিক করার সুপারিশ নাও করতে পারে; তবে কমিটির দায়িত্ব হলো সব টিকার ঝুঁকি ও সুফল পুনর্মূল্যায়ন করা।

এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী এক বছরে শিশুদের টিকার তালিকায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হতে পারে বলেও তিনি জানান।

কমিটি যদি কোনো পরিবর্তন আনে, তা চলতি মাসে ফেডারেল স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ঘোষিত টিকাসূচিতে বড় ধরনের রদবদল আনবে। টিকা সুপারিশের ক্ষেত্রে কমিটি যে দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসছিল, তা এড়িয়ে কেনেডি ও তাঁর নিযুক্ত ব্যক্তিরা একটি নতুন সূচি প্রবর্তন করেছেন। এতে সুপারিশকৃত টিকার সংখ্যা ১৭টি থেকে কমিয়ে ১১ টিতে নামানো হয়েছে এবং বাদ দেওয়া ছয়টি টিকা এখন থেকে কেবল ‘শেয়ার্ড ক্লিনিক্যাল ডিসিশন মেকিং’-এর আওতায় অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে পরামর্শের পর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে এ পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও বীমা কোম্পানি আগের টিকাসূচিই অনুসরণ করে যাচ্ছে, যা এখনো আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসসহ অন্যান্য চিকিৎসা সংগঠনের অনুমোদন পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সব ৫০টি অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ায় সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে শিশুদের ১৭টি রোগের টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক।

শিশুরা চিকিৎসাজনিত বা অন্যান্য কারণে টিকা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে। তবু স্কুলে ভর্তির শর্ত হিসেবে নিয়মিত টিকা বাধ্যতামূলক করাকে ‘কঠোর’ ও ‘কর্তৃত্ববাদী’ বলে মন্তব্য করেন ডা. মিলহোয়ান। তিনি বলেন, ‘আমরা যা করছি, তা হলো প্রথম সারিতে ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনকে ফিরিয়ে আনা। জনস্বাস্থ্য নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনই সবার আগে।’

সিয়াটেলের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ এবং এসিআইপি-এর সাবেক সদস্য ডক্টর হেলেন চু বলেন, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং জনস্বাস্থ্যের মধ্যে দ্বন্দ্বের ধারণাটিই পুরো ভুল। তিনি আরও বলেন, ‘এটি সত্য যে টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের অন্যদের সংক্রমিত করার সম্ভাবনা কম, তবে টিকা নেওয়ার প্রাথমিক কারণ হলো নিজেকে রক্ষা করা।’

ডা. মিলহোয়ান সম্ভবত টিকা–সংক্রান্ত কমিটির উদ্দেশ্যই ভুলভাবে বুঝেছেন বলে মন্তব্য করেন টিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও কমিটির সাবেক সদস্য নোয়েল ব্রিউয়ার। তিনি বলেন, ‘এসিআইপি পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য কোনটি সর্বোত্তম সে অনুযায়ী সুপারিশ করে।’ ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সব টিকাই রোগীর সম্মতির ভিত্তিতেই দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে এই স্বায়ত্তশাসনের মানে হলো, আমার সন্তানেরা যেন বাজারে যেতে পারে বা প্রিস্কুলে যেতে পারে এবং কোনো টিকা–প্রতিরোধযোগ্য রোগের দ্বারা তাদের তাড়া খেতে না হয়, যে রোগ তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। স্কুলে ভর্তির শর্ত হিসেবে টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা আমার সন্তান ও অন্য সব শিশুকে সুরক্ষা দেয়।’

ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেস-এর একজন মুখপাত্র ডা. মিলহোয়ানের মতামতের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পডকাস্টের সহ–সঞ্চালক ও সার্জন ডা. মার্ক আবদেলমালেক বলেন, ডা. মিলহোয়ান জনস্বাস্থ্যের একজন প্রবক্তা হিসেবে নয়, বরং একজন চিকিৎসক হিসেবে নিজের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই কমিটির কাজকে দেখছেন বলে মনে হয়েছে।

বিস্তৃত ওই সাক্ষাৎকারে ডা. মিলহোয়ান আরও দাবি করেন, তিনি এমন তথ্য দেখেছেন যা কোভিড টিকা থেকে শিশুদের মধ্যে ‘খুব বড় ধরনের মৃত্যুঝুঁকির ইঙ্গিত’ দেয়।

তিনি অন্তত ১০টি মৃত্যুর ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) তদন্ত করছে, তবে এখনো তা প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, একাধিক টিকার মাধ্যমে বারবার রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করলে অ্যালার্জি, হাঁপানি ও একজিমার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে উদ্বেগও দেখা দিচ্ছে।

তবে বড় পরিসরের গবেষণায় এ ধরনের দাবি নাকচ করা হয়েছে। এরপরও ডা. মিলহোয়ান বলেন, টিকা বিষয়ে ‘প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান’ যা ইঙ্গিত দেয়, তার চেয়ে তিনি নিজের পর্যবেক্ষণের ওপরই বেশি আস্থা রাখেন।

এ প্রসঙ্গে ডা. আবদেলমালেক বলেন, ‘টিকাগুলোকেই হুমকি হিসেবে দেখছেন তিনি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিশ্বে সর্বোচ্চ বেতন পেয়েও কেন পেশা ছাড়ছেন মার্কিন চিকিৎসকেরা

বাংলাদেশকে ‘শাস্তির’ হুমকি দিলেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ

আজকের রাশিফল: স্ত্রীর পরামর্শে ভাগ্য খুলবে, চারপাশের মানুষ ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে

আলোচিত বলিউড অভিনেতা কামাল খান গ্রেপ্তার

সৎ নেতাকে ভোট দিতে বলায় খতিবের দিকে তেড়ে গেলেন কিছু মুসল্লি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত