Ajker Patrika

মুক্তি পেলে সেনাপ্রধানের সঙ্গে বিরোধে যাবেন না ইমরান, তবে কি কোনো সমঝোতা হচ্ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মুক্তি পেলে সেনাপ্রধানের সঙ্গে বিরোধে যাবেন না ইমরান, তবে কি কোনো সমঝোতা হচ্ছে
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ছবি: এএফপি

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগার থেকে মুক্তি পেলে দেশটির সামরিক বাহিনী বা সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে নতুন করে বিরোধে জড়াবেন না বলে দাবি করেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি। তাঁর এই বক্তব্যকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরানের দলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিতগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখারি বলেন, ইমরান খান মুক্তি পেলে দেশের ক্ষতি হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ তিনি নেবেন না। দেশের স্বার্থে নিজের কষ্ট ও ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।

বুখারি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে, আপনি সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন। নিজের কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নিজের যন্ত্রণা দমন করতে হবে এবং দেশের কল্যাণের জন্য তা মেনে নিতে হবে।’

তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে একটি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান ও সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কমানোর সম্ভাব্য একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ইমরান খান ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই তিক্ত। ২০২২ সালে সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইমরানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। ২০২৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে তাঁর সমর্থকেরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন।

ইমরানের সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করে, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণেই তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছে। ইমরান নিজেও অতীতে মুনিরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। গত নভেম্বরে তাঁর নামে প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি মুনিরকে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘স্বৈরাচারী একনায়ক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানোর অভিযোগও করেছিলেন।

তখন ইমরান বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে যা-ই করা হোক না কেন, তিনি সামরিক নেতৃত্বের কাছে মাথা নত করবেন না।

তবে এখন তাঁর দলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বক্তব্যে ভিন্ন সুর দেখা যাচ্ছে। তাহলে সেনাবাহিনী ও ইমরানের দলের কোনো সমঝোতা হয়েছে?

বুখারি আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান চাইলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, পিটিআই ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি বা আলোচনাও চলছে না।

পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনী বুখারির বক্তব্য নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে থেকেই দেশটির সামরিক বাহিনী বলে আসছে, তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। অন্যদিকে সরকার বলে আসছে, ইমরানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতের বিষয়।

সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে নতুন আশা

গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। তাঁর চিকিৎসার জন্যই এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিটিআইয়ের মুখপাত্র বুখারি আদালতের সিদ্ধান্তকে ‘নতুন আশার আলো’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী হাসপাতালের বাইরে দলের নেতা-কর্মীদের জমায়েত না করার সিদ্ধান্ত মেনে চলবে পিটিআই।

তবে আজ বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়নি।

এদিকে ইমরানকে হাসপাতাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে সামরিক বাহিনী ও পিটিআইয়ের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক। তবে এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

ইমরানের অবস্থান কতটা বদলেছে, তা স্পষ্ট নয়

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, পিটিআইয়ের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্য আর ইমরান খানের ব্যক্তিগত অবস্থান এক নাও হতে পারে।

দলের অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে আছেন। অনেকে কারাগারে রয়েছেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের অভিযানে পিটিআইয়ের সাংগঠনিক কাঠামোর বড় অংশও দুর্বল হয়ে গেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘ইমরান কারাগারে থাকা অবস্থায় সম্ভাব্য কোনো আলোচনা বা সমঝোতায় পিটিআইয়ের নেতৃত্ব কতটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারবে, তা পরিষ্কার নয়।’

এদিকে বুখারি নিজেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন। তাঁর দাবি, পিটিআইয়ের শীর্ষ নেতারা প্রায় আট মাস ধরে ইমরানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ইমরানকে দীর্ঘ সময় ধরে অনেকটা একাকী অবস্থায় রাখা হয়েছে। ফলে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি কোনো বক্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে না।

সেপ্টেম্বরে আবারও আন্দোলনে পিটিআই

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আপাতত সংঘাত কমানোর ইঙ্গিত দিলেও আন্দোলনের কর্মসূচি থেকে সরে আসছে না পিটিআই। বুখারি জানিয়েছেন, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী পদযাত্রার কর্মসূচি পালন করবে দলটি।

ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া হোক বা না হোক, এই কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। কর্মসূচিতে আদালতের নির্দেশনায় ইমরানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তাঁর পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, আইনজীবী ও দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া এবং তাঁর মামলাগুলোর দ্রুত শুনানি দাবি করা হবে।

সবশেষে ইমরানের মুক্তির দাবিও জানানো হবে।

বুখারি বলেন, আত্মগোপনে থাকা পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতারাও এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন অথবা তা সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখবেন। তিনি বলেন, সামনে হয়তো দলের অনেক নেতাকে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যাবে। এমনকি তাঁরা প্রকাশ্যে না এলেও আন্দোলন সংগঠনে সক্রিয় থাকবেন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে সংসদীয় অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন ইমরান খান। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা করা হয়। তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। বর্তমানে ইমরান খান ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতির মামলায় ১৪ বছরের সাজা খাটছেন। তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিও একই মামলায় সাত বছরের সাজাপ্রাপ্ত। এসব মামলায় তাঁর প্রায় সব সাজাই স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। তবে কয়েকটি বিষয়ে আপিল এখনো চলমান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত