Ajker Patrika

নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, ইসরায়েলে সরকার গঠনের চাবি আরব দলগুলোর হাতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, ইসরায়েলে সরকার গঠনের চাবি আরব দলগুলোর হাতে
ইসরায়েলের নাজারেথ শহরে অবস্থিত প্রচার সদর দপ্তরে জয়েন্ট লিস্ট জোটের নেতা ইউসুফ জাবারিন (কেন্দ্রে-বামে) এবং অন্য সদস্যরা উল্লাসে মেতে উঠেছেন। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে বলে বুথফেরত জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দল দুটি সম্মিলিতভাবে ১৮ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে আরব দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব হবে নজিরবিহীন। একই সঙ্গে সরকার গঠনের সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে দল দুটি।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলেরে খবরে বলা হয়েছে, তিন প্রধান টেলিভিশন চ্যানেল—চ্যানেল ১১, চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩-এর বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো পেতে পারে ৫২টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন থেকে দুই পক্ষই পিছিয়ে রয়েছে।

তবে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবারের মধ্যে হালনাগাদ করা চ্যানেল ১২-এর জরিপে নেতানিয়াহুর জোটকে ৫২টি এবং ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোকে ৪৯টি আসন দেওয়া হয়েছে। এসব হিসাব অনুযায়ী, আরব দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সম্মিলিত আসনসংখ্যা মাত্র ১০। এবারের নির্বাচনে তাদের আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনার পেছনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের দল ওতজমা ইয়েহুদিতের প্রচারণার ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণায় দল দুটি আরব দলগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল।

আরব দল দুটি নেতানিয়াহুর আরেক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধী। বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, নেসেটে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ৬৮ থেকে ৬৯ হতে পারে। তবে ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন চারটি বিরোধী দলের মধ্যে তিনটি আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। ফলে নির্বাচনে আসন বাড়লেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিরোধী শিবিরে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন মানসুর আব্বাস

রা’আমের প্রধান মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে দুই শিবিরের প্রতিনিধিরাই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। চ্যানেল ১২-কে তিনি বলেন, ‘সবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলছে, শুধু পরিবর্তনপন্থী শিবির নয়।’ তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, নেতানিয়াহুপন্থী শিবিরের প্রতিনিধিরাও দলটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

বুথফেরত জরিপে রা’আম সাতটি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আব্বাস নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এ ধরনের জোটের মাধ্যমে বাস্তবে সরকার গঠন সম্ভব কি না, তা আগে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।

আব্বাস বলেন, ‘বর্তমানে সরকার গঠনের মতো আসনসংখ্যা নেই।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জায়োনিস্ট বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য ৫২টি আসনের সঙ্গে রা’আমের সাতটি আসন যোগ হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের চেয়ে দুই আসন কম থাকবে।

অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্ট ১০ বা ১১টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর বুথফেরত জরিপ। দলটির নির্বাচনী সদর দপ্তরে ফলাফলের পূর্বাভাস প্রকাশের পর সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা যায়। তাঁদের মুখে কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের উদ্দেশে ‘চলে যাও বেন গভির’ স্লোগান শোনা যায়।

জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসুফ জাবারিন ও দলের অন্য নেতারাও ওই স্লোগানে যোগ দেন। সমর্থকদের উদ্দেশে জাবারিন বলেন, তাঁদের দল নেতানিয়াহু, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচ এবং ‘রক্তে রঞ্জিত সরকারকে’ ক্ষমতা থেকে সরানোর আশা করছে।

বিরোধী দলগুলোর অবস্থানে অনিশ্চয়তা

নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসন সরকার গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিরোধী দলগুলোর একটি বড় অংশ তাদের সঙ্গে জোট করতে অনিচ্ছুক। ইয়াশা পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোট বুথফেরত জরিপের ফলকে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই ফল চূড়ান্ত হলে তা হবে ইসরায়েলের দায়িত্বশীল জায়োনিস্ট সংখ্যাগরিষ্ঠের বিজয়। তাঁর প্রতিশ্রুতি, তিনি দ্রুত নেতানিয়াহু সরকারকে সরিয়ে সর্বজনীন সামরিক নিয়োগের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি জায়োনিস্ট সরকার গঠনের উদ্যোগ নেবেন।

তবে আভিগদর লাইবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং নাফতালি বেনেতের বি’ইয়াখাদ পার্টি আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হতে পারে। অথচ বেনেট ও লিবারম্যান এর আগে ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রা’আমকে নিয়ে গঠিত একটি স্বল্পস্থায়ী সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আইজেনকোটের বক্তব্য থেকেও জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহু কিংবা অতি-গোঁড়া ইহুদিদের দলগুলোর সঙ্গে কাজ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও জটিল হয়ে উঠেছে।

তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৪ বা ২৫টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে। বর্তমানে দলটির আসনসংখ্যা ৩২। অন্যদিকে, আইজেনকোটের ইয়াশার ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে।

বুথফেরত জরিপে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত তারা সরকার গঠনের অংশীদার হতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এবং আনুষ্ঠানিক ফলাফলের ওপর। নির্বাচনের প্রাথমিক চিত্রে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে থাকলেও বিকল্প সরকার গঠনের পথও এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সাফল্যের পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত