Ajker Patrika

ইরানের সন্দেহজনক পারমাণবিক স্থাপনায় নির্মাণকাজ বেড়েছে, ফের হামলার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ০৩
ইরানের সন্দেহজনক পারমাণবিক স্থাপনায় নির্মাণকাজ বেড়েছে, ফের হামলার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ছবি। ছবি: সিএসআইএস

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ চলার সময় এ বছর ইরানের একটি সন্দেহজনক পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক নির্মাণকাজ হয়েছে। ছয় বছরের স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করে একদল বিশ্লেষক এ তথ্য জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে পরিচিত এই স্থাপনা ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের কাছে, তেহরান থেকে প্রায় ১৪০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। পশ্চিমা বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই জায়গাটি নিয়ে আলোচনা করে আসছে। তাদের ধারণা, ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখতে এটি একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

মার্কিন থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নতুন স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছর ওই স্থাপনায় ‘নির্মাণকাজে স্পষ্টভাবে বড় ধরনের বৃদ্ধি’ দেখা গেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে একচেটিয়াভাবে সিএনএনকে বিশ্লেষণটি দেওয়া হয়। সিএসআইএসের বিশ্লেষকদের মতে, ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনাটি সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ধারণা করছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইরান তার সেন্ট্রিফিউজগুলো এই স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এই স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা শিগগিরই পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কে কে সেখানে যাতায়াত করছে, আমরা সবাইকে জানি।’

তবে গ্রানাইটের এই পাহাড়টি এমন একটি কঠিন লক্ষ্য, যাতে পেন্টাগনের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী অপারমাণবিক’ বোমা দিয়েও হামলা চালানো কঠিন বলে জানিয়েছে সিএসআইএসের দলটি। আর বর্তমান প্রজন্মের অস্ত্রের নাগালের বাইরে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে ইরানের আরও কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনাকেও। তবে এসব স্থাপনায় হামলার কোনো উপায় বের করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করছে, এমন কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। ইরানের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী মূলত অন্য ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় বেশি মনোযোগ দিলেও এই প্রচেষ্টা চলছে।

যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করার চার দিন আগে, তথাকথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোকাবিলার দায়িত্বে থাকা পেন্টাগনের একটি অপেক্ষাকৃত অপরিচিত সংস্থার এক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে থাকা একটি ‘বিশেষ ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাকেন্দ্র’ মেরামতের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১২ লাখ ডলারের একটি চুক্তির অনুমোদন দেন।

চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি ‘লাইভ-ফায়ার পরীক্ষা’ পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া, যার মাধ্যমে ‘দ্রুত উদ্ভূত হুমকির বিরুদ্ধে গোপন সক্ষমতা’ যাচাই করা হবে। ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি বা ডিটিআরএর ওই নথি ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি ফেডারেল ডাটাবেসে আপলোড করা হয়। যুদ্ধ শুরুর এক দিন আগে, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিনই নথিটি প্রকাশ্যে আসে।

নথিতে বলা হয়, ‘দ্রুত পরীক্ষার প্রস্তুতি’ শেষ করতে হবে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে। আরেকটি ডাটাবেসে পেইট কনস্ট্রাকশনকে দেওয়া এই চুক্তিকে যে নামে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও বলা হয়, কাজটি ‘সময়-সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা নির্দেশনার’ কারণে দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, পরীক্ষাটির পরিকল্পনা ইরানের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর প্রয়োজন ছিল ইরানের সবচেয়ে গভীরে নির্মিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার একটি উপায় বের করা এবং সম্ভবত নির্দিষ্ট কিছু ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার অনুকরণে পরীক্ষা চালানো।

এর আগে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল। সামরিক বাহিনী ওই অভিযানকে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে অভিহিত করেছিল। ওই হামলায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছিল।

তবে গত বছর আইনপ্রণেতাদের এক শীর্ষ মার্কিন জেনারেল জানিয়েছিলেন, ইরানের গভীর ভূগর্ভে থাকা ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনার শুধু প্রবেশপথগুলোই ধ্বংসস্তূপে চাপা দেওয়া হয়েছিল। কারণ পেন্টাগনের ধারণা ছিল, ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’ বা এমওপি নামে পরিচিত তাদের বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমাগুলো দিয়ে স্থাপনাটি পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

বর্তমান এমওপির উত্তরসূরি হিসেবে আরও গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম একটি ‘নেক্সট জেনারেশন পেনিট্রেটর’ বোমা তৈরির কাজ করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এই নতুন অস্ত্রের একটি প্রোটোটাইপ তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু করার জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি চুক্তি দেওয়া হয়। এরপর চলতি বছরের জুনে বিমানবাহিনী নতুন অস্ত্রটির বিষয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগ্রহপত্র চায়।

সিএনএন পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হোয়াইট স্যান্ডসে ডিটিআরএ ও ইউএস স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড পরিচালিত একটি প্রত্যন্ত এলাকায় খননকাজ শুরু হয়। গভীর ভূগর্ভে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে অস্ত্রের প্রভাব পরীক্ষা করার জন্য জায়গাটি ব্যবহার করার কথা। এই সময়ের সঙ্গে জরুরি চুক্তির সময়ও মিলে যায়। ফেডারেল চুক্তির নথি অনুযায়ী, পেইট কনস্ট্রাকশন ১৭ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষার কাজের জন্য একটি ব্যয়ের হিসাব দেয় এবং পরদিন, অর্থাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি পায়।

অল্টারনেট সিসমিক হার্ডরক ইন সিটু টেস্ট সাইট—নামে পরিচিত ওই প্রত্যন্ত এলাকায় মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাজ চলতে থাকে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, খনন করে তোলা মাটির একটি স্তূপ ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। এরপর সেখানে এই দফার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে বলে ছবিতে মনে হয়।

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতো হোয়াইট স্যান্ডসের ডিটিআরএ পরীক্ষাকেন্দ্রটিও গ্রানাইটের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে একটি পরিবেশগত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই পরীক্ষা সত্যিই হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সিএনএন। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা ওই ডিটিআরএ স্থাপনায় ঠিক কী উদ্দেশ্যে কাজটি করা হয়েছিল, সেটিও নিশ্চিত করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি। এ বিষয়ে সিএনএনের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি পেন্টাগন। আর পেইট কনস্ট্রাকশনও সিএনএনের এক প্রতিবেদকের ফোনের জবাব দেয়নি।

পিকঅ্যাক্সে হামলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যকরী পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প হুমকি দেওয়ার সময় চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে যে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বিবেচনা করা হয়েছিল, সেখানেও পিকঅ্যাক্স ছিল বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে।

ওই সূত্রের মতে, পিকঅ্যাক্সে হামলার পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় কয়েকটি বোমা ব্যবহারের কথা ছিল। তবে ইরান সেখানে যা কিছু সরিয়ে নিয়ে থাকতে পারে, তা ধ্বংস করার জন্য এসব অস্ত্র যথেষ্ট গভীরে প্রবেশ করতে পারবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে সিদ্ধান্তমূলক হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরির কাজও অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা দপ্তরের বিভিন্ন অংশ সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি ‘প্ল্যানিং স্প্রিন্ট’ বা দ্রুতগতির পরিকল্পনা প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে।

সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের স্থাপনাটি সম্ভবত তিনটি উদ্দেশ্যের যেকোনো একটির জন্য তৈরি করা হচ্ছে এবং তিনটিই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি হতে পারে সেন্ট্রিফিউজ সংযোজনের একটি কারখানা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি স্থাপনা অথবা ইউরেনিয়াম ধাতুতে রূপান্তরের মতো অন্যান্য ‘পারমাণবিক অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট’ কাজের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

সিএসআইএসের বিশ্লেষকেরা তাদের প্রতিবেদনে বলেছেন, স্থাপনাটিতে দেখা নির্মাণকাজ এখন সক্রিয় খনন থেকে সরে গিয়ে সম্ভবত ভেতরের নির্মাণকাজ এবং বাইরের অংশ আরও শক্তিশালী করার পর্যায়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সড়ক চলাচল’ দেখা গেছে। সেখানে আরও যেসব কাজ হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে টানেলের প্রবেশপথগুলো আরও উঁচু ও শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক পাকা করা, প্রবেশপথের আশপাশের অংশ শক্তিশালী করা এবং টানেল নির্মাণের সময় খনন করে তোলা মাটি সমতল করা ও সরিয়ে ফেলা।

তবে সিএসআইএসের বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, তারা পিকঅ্যাক্সে যে ‘ধারাবাহিক নির্মাণকাজ’ পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা অন্যান্য বিষয়সহ ইঙ্গিত করে যে স্থাপনাটি এখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজের জন্য প্রস্তুত নয়, যদি সেটিই এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত