Ajker Patrika

হুতিদের ড্রোন হামলা, গুরুত্বপূর্ণ তেলের পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি আরব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হুতিদের ড্রোন হামলা, গুরুত্বপূর্ণ তেলের পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি আরব
আরব উপদ্বীপের ওপর দিয়ে এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দিত। ছবি: প্ল্যানেট ল্যাবস

লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এর মধ্যবর্তী পেরিম দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। এরপরই সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পরিবহনব্যবস্থায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। এ অবস্থায় নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন মাধ্যম ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব সাময়িকভাবে এই পাইপলাইন বন্ধ করে। বাগদাদ ও রিয়াদ জানিয়েছে, পাইপলাইনে ড্রোন হামলাটি চালানো হয়েছে ইরাক থেকে। সেখানে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়। হামলার জেরে শনিবার ইরাকের এক সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

আরব উপদ্বীপের ওপর দিয়ে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জট এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে বর্তমানে ওই প্রণালিতে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল। এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান।

ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার সময় এই হামলা হলো। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে হুতিদের তৎপরতা মিলে আরব উপদ্বীপের দুই পাশেই জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, শুক্রবার লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করেছে হুতিরা।

শুক্রবারের পাইপলাইন ও পেরিম দ্বীপে চালানো হামলা যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে থাকার সময়ে পরিস্থিতির বিপজ্জনক অবনতি ঘটাতে পারে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তা চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদন করেছে সৌদি আরব। এদিকে যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টিকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা হয়।

হামলার জন্য কারা দায়ী, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। তবে রপ্তানিতে এর কী প্রভাব পড়েছে, তা জানানো হয়নি।

শনিবার ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বরখাস্ত হওয়া সামরিক কমান্ডার মায়সান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতেন। দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকের এই প্রদেশটির সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মায়সানকে ইরানপন্থী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ও প্রভাবের এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর এখন পর্যন্ত পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সৌদি আরব। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে। তবে তারা বলেছে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা’ নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে। ইরাক সরকার হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) শুক্রবার জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এর একটি কারণ, বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলা।

নিরাপত্তার স্বার্থে ইরাক ও ইরানের মধ্যকার শালামচেহ সীমান্ত চৌকি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ইরাক। রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর দুটি সূত্র। ইরান থেকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য ইরাকে আমদানির অন্যতম প্রধান পথ এই সীমান্ত চৌকি।

ওই দুই সূত্র আরও জানিয়েছে, পাইপলাইনে হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে ব্যাপক অভিযান চলছে।

পাল্টা হামলার প্রস্তুতি

হুতিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে তাদের মিত্র ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, হুতিদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা তারা করবে। হুতিরা পাহাড়ি যোদ্ধাদের একটি গোষ্ঠী। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের সময় সৌদি আরবের ভয়াবহ বিমান হামলার বছরের পর বছরও তারা টিকে ছিল। চলতি সপ্তাহে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দ্রুতগতির অভিযানে তারা বেশ কিছু এলাকা দখল করেছে।

রয়টার্স বৃহস্পতিবার জানিয়েছিল, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের নাটকীয় অগ্রযাত্রার পেছনে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সরাসরি নির্দেশনা ছিল।

ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা আরও বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এ জন্য তাদের আরও অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তেহরান।

ইরান হুতিদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করে। তবে প্রকাশ্যে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে দেশটি। ইরানের ভাষ্য, হুতিরা তাদের ‘প্রক্সি’ বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি নয়।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া সব ধরনের জাহাজের জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদ রয়েছে। সৌদি জাহাজের ওপর আগে ঘোষণা করা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইছে সৌদি

রয়টার্সকে শুক্রবার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। অ্যাক্সিওসের আগের একটি প্রতিবেদনের সত্যতাও নিশ্চিত করেছে সূত্র দুটি।

তারা জানিয়েছে, ওয়াশিংটন রিয়াদকে বলেছে, এই মুহূর্তে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে তারা রাজি নয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

দুই নেতার মধ্যে কোনো ফোনালাপ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত