
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেই চলেছেন, প্রায় এক মাস আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে তিনি যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা শেষ করতে ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই ন্যারেটিভের বড় সমস্যা হলো—ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার এমন কোনো আলোচনা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
এই অবস্থায় যুদ্ধের ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিবেশ ও সব পক্ষের প্রচারযুদ্ধের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করা উচিত, তা বোঝা কঠিন। তবে সম্ভাব্য আলোচনায় এবং যুদ্ধ শেষ হলে কে কী লাভ পেতে পারে, তা বিশ্লেষণ করলে কিছুটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
ট্রাম্প বলেছেন, এক অজ্ঞাতনামা ‘শীর্ষ’ ইরানি ব্যক্তির সঙ্গে ‘খুব ভালো’ বৈঠকের পর ‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সমঝোতা’ হয়েছে। তিনি এই মন্তব্য করেন ঠিক তখনই, যখন মার্কিন শেয়ারবাজার নতুন সপ্তাহে চালু হচ্ছিল। ইরানকে ইতিবাচক জবাব দিতে তিনি যে পাঁচ দিনের সময়সীমা দিয়েছেন, সেটিও কাকতালীয়ভাবে ট্রেডিং সপ্তাহের শেষ সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।
অনেকে এই সময় নির্ধারণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী তেলের দাম ওঠানামা করেছে এবং গত সপ্তাহে তা ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল। এটি ট্রাম্পের আলোচনার কথা বলার আরেকটি কারণও হতে পারে। ওয়াশিংটন যদি ইরানের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের স্থল অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন সেনা মোতায়েনের সময় পাওয়া যাবে।
ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেই ব্যক্তিও, যাকে অনেকে ট্রাম্পের উল্লেখ করা ইরানি কর্মকর্তা বলে মনে করছেন। তিনি হলেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। ভুয়া খবর ব্যবহার করা হচ্ছে আর্থিক ও তেলের বাজারকে প্রভাবিত করতে এবং যে সংকটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আটকে আছে, সেখান থেকে বের হতে।’
শেয়ারবাজার ও তেলের দামের ওপর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ইরানের জন্যও তা প্রাসঙ্গিক। তবে তেহরানের লাভ হচ্ছে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি হলো, এই যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেন অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করে। ভবিষ্যতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র যেন আবার ইরানের ওপর হামলা চালাতে সাহস না পায়, সেটাই তাদের লক্ষ্য। সুতরাং বাজারকে শান্ত করতে আলোচনার কথা বাড়িয়ে বলা যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে, তেমনি ঠিক উল্টোভাবে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জোর দিয়ে বলা ইরানের স্বার্থে। এতে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো স্বস্তির সুযোগ পাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কী
আলোচনাকে ঘিরে দুই পক্ষেরই নিজস্ব ন্যারেটিভ আছে। জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্য থেকে বোঝা কঠিন, আদৌ কোনো আলোচনা চলছে কি না, বা হলে তা কীভাবে হচ্ছে। এতে বরং প্রশ্ন ওঠে, বর্তমান পর্যায়ে আলোচনা এবং যুদ্ধের সমাপ্তি থেকে দুই পক্ষ কী লাভ পেতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে যে সংঘাত তিনি শুরু করেছিলেন, তার পরিণতি এবং ইরান রাষ্ট্র যে ভেঙে না পড়ে আঘাত সহ্য করতে পারবে—এ বিষয়টি ট্রাম্প ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলেই মনে হচ্ছে। তিনি গত সপ্তাহে বলেন, ‘ওদের তো মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে হামলা করার কথা ছিল না... কেউ এটা আশা করেনি।’ তিনি আরও যোগ করেন, এমনকি ‘সেরা বিশেষজ্ঞরাও’ এটি বিশ্বাস করেননি।
যদিও বাস্তবে বিশেষজ্ঞরা, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও বারবার এ ধরনের সতর্কতা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন বাস্তব পরিস্থিতি ট্রাম্পকে সেই পরিণতি বুঝতে বাধ্য করেছে, যা তিনি আগে উপেক্ষা করেছিলেন। তাঁর কিছু মিত্র ও সমর্থক হয়তো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সমঝোতা করার প্রবণতা ট্রাম্প আগে দেখিয়েছেন। তাই এই ক্ষেত্রেও তিনি সমঝোতার সুবিধা দেখতে পারেন—এটা অস্বাভাবিক নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে কিছু ইরানি তেলের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তেলের দাম কমানো যায়। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম ইরানের কোনো তেলের ওপর এ ধরনের ছাড় দেওয়া হলো। ইরান নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছে, এই ছাড় এসেছে তাদের সেই নীতির ফল হিসেবে, যেখানে তারা সংঘাতকে উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
এই যুদ্ধ আগেই যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় ছিল। এখন তা আরও বেশি অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ ভোক্তারা পেট্রলের দাম বাড়ার প্রভাব দেখছেন এবং অর্থনীতির অন্য খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যেই বছরের শেষে কংগ্রেস নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল খারাপ ফল করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতএব ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ রয়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে গেলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। আর যুদ্ধ শেষ করলে সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। কারণ, তিনি এটিকে ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ বলেছিলেন; কিন্তু শেষ করতে পারেননি।
ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি কী
তবে ট্রাম্প যা-ই চান না কেন, সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তাঁর হাতে নেই। এক বছরের কম সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো হামলার শিকার হওয়ায়, ভবিষ্যতে আরেকটি হামলা ঠেকানোর মতো কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা না পাওয়া পর্যন্ত ইরানের যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহ কম বলে মনে হচ্ছে। আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় পূর্বঘোষিত হামলা এবং ধীরে ধীরে উত্তেজনা বাড়ানোর যে কৌশল ছিল, তা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান যুদ্ধের শুরু থেকেই বোঝা গেছে, ইরান কৌশল বদলেছে এবং সংযম দেখাতে আগের মতো আগ্রহী নয়।
এখন ইরানের জন্য সংঘাত দীর্ঘায়িত করা এবং পুরো অঞ্চলে আরও ক্ষতি সৃষ্টি করা লাভজনক হতে পারে, যদি তারা নিজেদের টিকে থাকা নিশ্চিত করতে চায়। এমন বিশ্বাসও থাকতে পারে যে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ইন্টারসেপ্টর) মজুত কমে যাচ্ছে। ফলে ইরান আরও কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারছে। বিশেষ করে ইরানের কঠোরপন্থীরা, যারা এখন প্রভাবশালী, ভাবতে পারেন, এখন থামার সময় নয়। কারণ, এতে ইসরায়েল তাদের প্রতিরক্ষা মজুত আবার পূরণ করার সুযোগ পাবে।
তবু ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে। উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে এবং বারবার ইরানি হামলার পর যুদ্ধ শেষে সেই সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
ইরানের তুলনামূলক মধ্যপন্থী নেতারা এসব দেখে মনে করতে পারেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তারা যুক্তি দিতে পারেন যে কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমতা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে, তাই এখন আলোচনার সময় এসেছে। আর যদি তারা কিছু ছাড় পায়, যেমন ভবিষ্যতে আর হামলা না করার প্রতিশ্রুতি অথবা হরমুজ প্রণালিতে বেশি কর্তৃত্ব; তাহলে তারা মনে করতে পারেন, সমঝোতায় যাওয়ার সময় এখনই।

ইরান জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হচ্ছে না। ইরানি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজেদের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। ইরানের এই প্রতিক্রিয়া এমন সময়ে এল, যার একদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প...
১৬ মিনিট আগে
ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবানন দখলের পরিকল্পনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কানাডা। সতর্ক করে দেশটি বলেছে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা ‘অবশ্যই লঙ্ঘন করা যাবে না’। উত্তরের প্রতিবেশী দেশটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর বড় ধরনের স্থল অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যেই এমন সতর্কবার্তা দিল কানাডা।
২ ঘণ্টা আগে
ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে চলা যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে রাজি হতে ইরান পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটর এই তথ্য জানিয়েছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফা শর্ত পাঠিয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মন্ত্রণালয় তথা পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর এলিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার সৈন্য পাঠাতে যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
৪ ঘণ্টা আগে