Ajker Patrika

মার্কিন হামলা বন্ধ হওয়ায় থামল ইরানও, অস্ত্র সংকটকে কূটনৈতিক সুযোগ বলছে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৪২
মার্কিন হামলা বন্ধ হওয়ায় থামল ইরানও, অস্ত্র সংকটকে কূটনৈতিক সুযোগ বলছে যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

টানা ১৩ রাতের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ ইরানে বোমাবর্ষণ স্থগিত করে কূটনীতিকে আরও সময় দেওয়ার কথা বললেও, মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য বলছে ভিন্ন বাস্তবতা। হামলার জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তু প্রায় শেষ হয়ে আসা এবং গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ওয়াশিংটন বিরতিতে গেছে বলে জানা গেছে। এর পরই ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ রাখলে তারাও পাল্টা হামলা চালাবে না। তবে তেহরানের দাবি, এই বিরতি শান্তির আন্তরিক উদ্যোগ নয়, বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা বন্ধ রাখলে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখবে। গতকাল রোববার দিনের শেষভাগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তাঁকে জানিয়েছেন, হামলার জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তু প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র তাদের বোমা হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে।

ইরানের ওপর টানা ১৩ রাত ধরে মার্কিন বিমান হামলার পর গত শুক্রবার গভীর রাতে পেন্টাগন এই অভিযান স্থগিত করে। এরপর শনিবার ও রোববার যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাতের হামলার জবাবে যেসব প্রতিবেশী দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে হামলা চালিয়ে আসা ইরানও গত দুই দিন কোনো হামলা করেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই ইরানি কর্মকর্তা বলেন, তেহরানের অবস্থান এখনো একই। তিনি বলেন, ‘হামলার জবাব হামলা। যদি হামলা বন্ধ হয়, তাহলে ইরানও তাদের অভিযান বন্ধ করবে। এই বার্তা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ গণমাধ্যমকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনার জন্য আরও সময় দিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওয়াল্টজ বলেন, ‘তিনি আলোচনাকে কিছুটা সময় দিচ্ছেন, কিছুটা সুযোগ দিচ্ছেন।’ তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের প্রতি ইরানের হুমকি ঠেকাতে চালানো বোমা হামলায় আগে থেকে নির্ধারিত প্রায় সব লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত করা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে, এমন সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুদ আরও কমে যাবে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।

জেনারেল কেইনের দপ্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা সাধারণত দায়িত্বে থাকা কোনো প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া পরামর্শ সম্পর্কে, এমনকি কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ও, মন্তব্য করেন না।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে মাইক ওয়াল্টজ আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর যা দরকার, সবই তাদের রয়েছে।’ তবে তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার সময় ‘তিনি একটি দুর্বল ও অস্ত্রসংকটে থাকা পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা একই জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্পের হামলা বন্ধের সিদ্ধান্তকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না। তিনি বলেন, ‘হামলা বন্ধ হওয়া নিয়ে আশার চেয়ে সন্দেহই বেশি। আমাদের ধারণা, এই বিরতি আন্তরিক নয়, বরং কৌশলগত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণা নিয়ে ইরানের তিক্ত অভিজ্ঞতা যথেষ্ট।’

অনিশ্চয়তায় আটকে ভবিষ্যৎ

গত দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি রাতেই ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে আসছিল। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের হামলার জবাব হিসেবেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পানি লবণমুক্তকরণ (ডিস্যালিনেশন) স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের দাবি, তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে যেত। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুরু করা সামরিক অভিযান কার্যত গত মাসে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিকে ভেস্তে দিয়েছে।

ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত আসে শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর। একাধিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ওই বৈঠকে জেনারেল ড্যান কেইনসহ জ্যেষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টারা হামলা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এ বিষয়ে আপত্তি বা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে অ্যাক্সিওস জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সর্বাধিনায়ক অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার মতে, এই অভিযান কার্যকারিতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে।

তবে ইরানের সাধারণ মানুষ এখনো উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তেহরানের ৪৯ বছর বয়সী আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ী নাদের রয়টার্সকে টেলিফোনে বলেন, হামলা বন্ধের এই বিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাঁর ভাষায়, ‘দেশের সবাই যেন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে খেলছেন। তিনি না যুদ্ধ শেষ করে অঞ্চল ছেড়ে যাচ্ছেন, না আবার চূড়ান্তভাবে হামলা চালাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি খুবই ক্লান্তিকর।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত