Ajker Patrika

জীবন বাঁচিয়েছিল কুকুর—লেবাননে এর প্রতিদান দিচ্ছেন হুসেইন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
জীবন বাঁচিয়েছিল কুকুর—লেবাননে এর প্রতিদান দিচ্ছেন হুসেইন
বেকা উপত্যকা থেকে উদ্ধার করা একটি উটকে আলিঙ্গন করছেন হুসেইন হামজে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের সময় এক রাতে কুকুরের ডাক শুনে ঘুম ভেঙে যায় হুসেইন হামজের। পোষা কুকুরটির কী হয়েছে, খোঁজ নিতে তিনি বিছানা ছেড়েছিলেন। এর ঠিক পরপরই তাঁর ঘরের পাশে একটি বোমা এসে পড়ে। আর যে জায়গাটিতে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক সেখানেই এসে বিধে একটি বোমার স্প্লিন্টার!

সেদিন অলৌকিকভাবে প্রাণ বেঁচে যায় হুসেইনের। ঘটনাটি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘পশুদের মধ্যে এমন এক ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে যা মানুষের নেই। কুকুরটি সত্যিই আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল।’

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে—দীর্ঘ ২০ বছর ও দুটি যুদ্ধের পর, ৫৭ বছর বয়সী হুসেইন আজও সেই ঋণের বোঝা বয়ে চলছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়। নিজের প্রাণ বাঁচানো সেই কুকুরের স্মরণে তিনি দক্ষিণ লেবাননের জেফতা গ্রামে ‘মাশালা’ নামের একটি পশুখামার ও আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। স্বাভাবিক সময়ে এটি কুড়িয়ে পাওয়া প্রাণীদের আশ্রয়স্থল হলেও, যুদ্ধের দিনগুলোতে পুরো এলাকার প্রাণীদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছেন হুসেইন।

গত মার্চে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক যুদ্ধে যখন দক্ষিণ লেবাননের এক-চতুর্থাংশ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান, তখন গ্রামে থেকে যাওয়া মাত্র ২০ জনের একজন ছিলেন হুসেইন। একের পর এক ড্রোন আর বিমান হামলার মুখেও তিনি থেকে যান শুধু পশুগুলোর পরিচর্যার জন্য। গ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই পোষা প্রাণীদের শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে গিয়েছিলেন। হুসেইন ও তাঁর সহযোগীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রাণীগুলোর বাঁধন খুলে দিতেন এবং খাওয়ার পানি পৌঁছে দিতেন। যুদ্ধের দিনগুলোতে প্রায় ৫০টি কুকুর খাবারের সন্ধানে নিজে থেকেই হুসেইনের আশ্রমে চলে এসেছিল।

হুসেইন তাঁর পুরোনো ট্রাকে করে প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে পরিত্যক্ত কুকুর ও গবাদিপশুকে শুকনা খাবার ও পানি পৌঁছে দিতেন। ড্রোন হামলার ঝুঁকি এড়াতে তিনি তাঁর গাড়ির ছাদে ‘মাশালা’ আশ্রয়কেন্দ্রের সাইনবোর্ড লাগিয়ে নিয়েছিলেন। তবুও আতঙ্কের শেষ ছিল না। তাঁর কাজের জায়গার ঠিক পাশেই একাধিকবার বিমান হামলা হয়েছে। একবার খাবার দিতে গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত এক ব্যক্তির লাশও দেখতে পেয়েছেন তিনি। তবুও তিনি থেমে যাননি। হুসেইন বলেন, ‘আমার নিজের জন্য কোনো ভয় ছিল না। ভয় হয় শুধু এই অবলা প্রাণীগুলোর জন্য।’

দক্ষিণ লেবাননের জেফতা গ্রামে হুসেইন হামজের ‘মাশালা’ পশুখামার ও আশ্রয়কেন্দ্র। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
দক্ষিণ লেবাননের জেফতা গ্রামে হুসেইন হামজের ‘মাশালা’ পশুখামার ও আশ্রয়কেন্দ্র। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

জুন মাসে যুদ্ধবিরতির পর লেবাননে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। বোমার তীব্র শব্দ এখন আর কুকুরদের আতঙ্কিত করে না। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও হুসেইনের ব্যস্ততা কমেনি। যুদ্ধের সময় ড্রোন উপেক্ষা করে পশুদের খাবার দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হলে প্রচুর অনুদান আসত, যা এখন ধীরে ধীরে কমে এসেছে।

হুসেইন আশা করেন, একদিন মানুষ পশুদের প্রতি আরও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘পশুদের প্রতি যার দয়া নেই, মানুষের প্রতিও তার কোনো দয়া থাকতে পারে না।’ আর এই বিশ্বাস নিয়েই লেবাননের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রান্তরে পশুদের পরম বন্ধু হয়ে টিকে আছেন হুসেইন হামজে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত