Ajker Patrika

সমুদ্রপথ সুরক্ষায় সামরিক জোটের ঘোষণা সৌদির, আছে বাংলাদেশও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সমুদ্রপথ সুরক্ষায় সামরিক জোটের ঘোষণা সৌদির, আছে বাংলাদেশও
ইয়েমেন উপকূলে বাব এল–মান্দেব প্রণালিতে মাছ ধরা নৌকা। ছবি: এএফপি

লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নৌ–সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরবসহ ১৪টি দেশ। এই জোটে আছে বাংলাদেশও। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মিলিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’। জোটভুক্ত দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারত মহাসাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জলপথে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের রুট পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত যখন হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চরম আকার নিয়েছে, ঠিক তখনই এল এই যৌথ পদক্ষেপ। বিশ্ব বাজারের ২০ শতাংশের মতো জ্বালানি পরিবাহিত হওয়া এই জলপথটি বলতে গেলে বন্ধই হয়ে পড়েছে, যার ভারে এখন টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। এর মধ্যেই আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের আক্রমণ। বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগরের নৌপথগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

এই জোট গঠনের আলোচনায় অংশ নিতে ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যার মধ্যে সাড়া দিয়ে বৈঠকে হাজির হয়েছিল ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। যদিও লোহিত সাগরে আগে থেকেই ইইউর ‘অ্যাস্পাইডস’ নামে একটি নিজস্ব নৌ নিরাপত্তা মিশন চালু রয়েছে; ফলে সৌদি-নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোটের কার্যক্রম তাদের চেয়ে কতটা আলাদা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সৌদি আরব ছাড়া এই জোটে স্বাক্ষরকারী বাকি ১৩টি দেশ হলো—তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান এবং কমোরোস। তবে একটি বিষয় বেশ চোখ টানে—ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ওমানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো এই চুক্তিতে সই করেনি।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটের সনদে যুক্ত হওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে।’ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সদস্য দেশগুলোর দৃঢ় বিশ্বাস—সামুদ্রিক নিরাপত্তা কোনো একক দেশের বিষয় নয়, এটা যৌথ দায়িত্ব। আন্তসীমান্ত নৌ হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ই প্রধান মূলধন।

কোন দেশ ঠিক কতগুলো যুদ্ধজাহাজ বা বিমান পাঠাবে, সে তথ্য এখনই প্রকাশ করা হয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং একযোগে নৌ অভিযান পরিচালনার বিষয়টি এই জোটের মূল কার্যপরিধির মধ্যে থাকছে। জোটের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগ পুরোটাই আত্মরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি।

এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সৌদি আরব, এবং তাদের ভূখণ্ডেই বসছে এই জোটের প্রধান কার্যালয়—যদিও ঠিক কোন শহরে হেডকোয়ার্টার হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। গত সপ্তাহেই ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ওপর একধরনের সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়, যার ফলে লোহিত সাগরে ঘুরিয়ে দেওয়া সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচল মারাত্মক বিঘ্নিত হয়।

গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পর থেকে সৌদি আরব অবশ্য ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের সাহায্যে নিজেদের অধিকাংশ তেল রফতানি সচল রাখতে পেরেছে। এই পাইপলাইনটি দেশের পূর্বাঞ্চলের তেল শোধনাগারগুলোকে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, সৌদি রফতানির সেই জাহাজগুলোকে শেষ পর্যন্ত বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতেই হয়। এরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থান এই সংকীর্ণ পানিপথের। ইয়েমেনের যে অংশটি এই প্রণালির মুখোমুখি, তার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে। আর এটাই লোহিত সাগরে যেকোনো জাহাজে আঘাত হানার ক্ষেত্রে তাদের এক বাড়তি কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।

বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশই সম্পন্ন হয় এই প্রণালি দিয়ে, যার মধ্যে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলও রয়েছে। এছাড়া লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার মাত্র দুটি পথের একটি এটি—অন্যটি সুয়েজ খাল। সবচেয়ে সরু পয়েন্টে বাব আল-মান্দেব মাত্র ২৯ কিলোমিটার (১৮ মাইল) চওড়া, ফলে জাহাজ চলাচলের জন্য মাত্র দুটি সরু পথ উন্মুক্ত থাকে। কাজেই এই অঞ্চলে সামান্য বিশৃঙ্খলাও বিশ্বজুড়ে নতুন করে জ্বালানি সংকটের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত