
মনে করুন, আপনার পরিচিত স্কুলপড়ুয়া মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী, মা–খালা–ফুফু এবং দাদী-নানী কারাগারে বন্দী। কারারক্ষীরা তাদের স্রেফ পাজামা পরা অবস্থায় উপুড় করে শুইয়ে রেখেছে এবং তাদের হাত পেছনে বাঁধা। সামান্য নড়াচড়া করলেই কারারক্ষীরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মারধর করছে। এমন দৃশ্য একবার দেখলে কী আপনি ভুলতে পারবেন? সম্ভব নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নারীদের সঙ্গে ঠিক এমনটাই হয়ে আসছে।
যখন কোনো নারী বন্দি বলেন, কারাগারে তাঁর কাছে ‘নিজের হৃদয় ছাড়া আর কিছুই ছিল না।’ তখনই বোঝা যায় কারাগার কীভাবে একটি জীবনের ভিত ভেঙে দিতে পারে।
প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল ফিলিস্তিনি বন্দী দিবস পালন করা হয় চলমান ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরতে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও ভয়াবহ। ২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে অনাহার, বিচ্ছিন্নতা, অপমান, নগ্ন তল্লাশি, নির্যাতন এবং গভীর আতঙ্ক—এসবই ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনি নারীদের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, গাজায় গণহত্যা শুরুর পর থেকে ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজা থেকে ৭ শতাধিক ফিলিস্তিনি নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বা সামরিক চেকপয়েন্টে আটক করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় এবং পরে তাদের অধিকাংশই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
রামাল্লাভিত্তিক আইনজীবী সাহার ফ্রান্সিস বন্দীদের অধিকারবিষয়ক সংগঠন আদদামীরের সাবেক পরিচালক। সম্প্রতি তিনি ‘উইমেন, প্রিজন সুমুদ’—শীর্ষক এক ওয়েবিনারে বলেন, ‘১৯৯০-এর দশকের কারাগারের সঙ্গে এখনকার কোনো মিল নেই। গণহত্যার পর সবকিছু বদলে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘গাজা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর পাঁচ মাস আটক থাকার পর মানুষগুলোকে যখন কথা বলতে না পারার মতো অবস্থায় দেখেছি—যে মাত্রার নির্যাতন, অনাহার আর শারীরিক হামলার শিকার তারা হয়েছে—তা ছিল ভয়াবহ। আমরা বন্দিদের রক্ষা করতে পারিনি।’
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হেফাজতে প্রায় ৯০ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী কিশোর ওয়ালিদ খালিদ আবদুল্লাহ আহমেদও ছিল। ফ্রান্সিস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কার্যত কাজ করছে না...সর্বত্র ভণ্ডামি। আমরা আইনজীবীরাই বন্দিদের একমাত্র জানালা। মানুষ আশাহীন হয়ে পড়ছে।’
দশকের পর দশক ধরে আদদামীর ইসরায়েলি কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করে আসছে এবং সেগুলো বিশ্বজুড়ে তুলে ধরছে। তাদের এসব প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র। কিন্তু এই কাজের কারণেই সংগঠনটি বারবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে তাদের কার্যালয়ে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে।
২০২১ সালে ইসরায়েল সরকার আদদামীরসহ আরও পাঁচটি ফিলিস্তিনি অধিকার সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। গত বছর কথিত ‘সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগও আদদামীরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এগুলো সবই ইসরায়েলের বৃহত্তর সহিংস আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলের অংশ। নাবলুসের আন-নাজাহ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেসের ভিজিটিং প্রফেসর ড. সামাহ সালেহর মতে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে অনাহার ও মানবিক মর্যাদাহানি—এই দুটিকে নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
সালেহ ওয়েবিনারে বলেন, ইসরায়েলি হেফাজতে থাকা নারীরা মুক্তি পাওয়ার পরও নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। বন্দিদের গোসল করতে দেওয়া হয় না, পরিষ্কার কাপড় দেওয়া হয় না, তাদের ঘুম বঞ্চিত করা হয়, খাবারও অপ্রতুল দেওয়া হয়। অনেক সময় দিনে কয়েক টুকরো রুটি আর সামান্য ফল বা দইয়ের কয়েক চামচই তাদের খাবার। এর মধ্যে স্ক্যাবিসের জীবাণু তাদের ত্বকে ঢুকে পড়ে।
ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করা ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের ভিজিটিং স্কলার গবেষক দালাল বাজেস বলেন, আটক অবস্থায় ‘সবকিছুই কেড়ে নেওয়া হয়।’ তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, গণহত্যা শুরুর পর থেকে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা, আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা এবং ধর্ষণের হুমকি—এসব এখন যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
লেখক লামা খাতির ২০১৮-১৯ সালে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন। দালাল বাজেস তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেখানে লামা খাতির বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর আবার কারাবন্দি হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শাসনব্যবস্থার’ মতো। লামা খাতির বলেন, ‘আমরা আর সময়ের ভেতর বেঁচে ছিলাম না; আমরা শুধু শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকতাম।’ লামা খাতিরের মামলার সারসংক্ষেপে বাজেস উল্লেখ করেন, বই, কাগজ, খবর কিংবা কোনো দৈনন্দিন রুটিনের অনুপস্থিতি ‘সময়কে এক দমনমূলক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে’ ইসরায়েল।
বাজেসের তথ্যানুযায়ী, ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে আনুমানিক ১ লাখ ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে। পরবর্তী দশকগুলোতে এই গতি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। ১৯৬৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা যায়, যার মধ্যে ১৬ হাজারের বেশি নারী।
গত মাস পর্যন্ত ৭২ জন ফিলিস্তিনি নারী ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি ছিলেন, যাদের বেশিরভাগই উত্তরের দামোন কারাগারে রাখা হয়েছিল। তাদের অধিকাংশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দখলকৃত পশ্চিম তীর ও জেরুজালেম থেকে। এই বন্দিদের মধ্যে তিনজন নাবালক এবং ৩২ জন মা, যাদের সম্মিলিতভাবে ১৩০ জন সন্তান রয়েছে। এ ছাড়া ১৭ জন নারীকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনে বা প্রশাসনিক আটকাদেশে রাখা হয়েছে, যেখানে কোনো অভিযোগ বা বিচার নেই। পাঁচজন বন্দি সাজা ভোগ করছেন, যার মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা ১৬ বছর। অন্যদিকে অনেকে এখনো বিচারের অপেক্ষায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৮ জন বন্দি অসুস্থ, যার মধ্যে তিনজন ক্যান্সারে আক্রান্ত। বিচারাধীনদের মধ্যে এক ডজনের বেশি নারীকে ‘উসকানি’র অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনলাইন কার্যক্রম, যেমন—কোনো কনটেন্ট একাধিক বার পোস্ট করা বা ব্যক্তিগত মতামত শেয়ার করার মতো বিষয়কে উসকানি হিসেবে দেখিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে ডিজিটাল জগৎ এখন কঠোর নজরদারি ও বিচারের এক নিয়ন্ত্রিত পরিসরে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সাংবাদিক, কর্মী এবং মানবাধিকার রক্ষাকারীদের লক্ষ্যবস্তু করছে।
প্রতিবেদনে থাকা সাক্ষ্যগুলো ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে। এক বন্দি হাশারন কারাগারে স্থানান্তরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘এক নারী সেনা...আমাকে একটি ছোট, নোংরা নির্জন সেলে নিয়ে যায়, যেখানে মেঝেতে একটি গদি ছাড়া কিছুই ছিল না—না কম্বল, না বালিশ—আর ছিল খুব ছোট একটি বাথরুম। আমি সেখানে চার দিন একা ছিলাম, কেউ আমার সঙ্গে কথা বলেনি। তারা ঠান্ডা, বাসি খাবার দিত, আর ওই চার দিনে আমি কিছুই খাইনি।’
কিছু নারীকে গ্রেপ্তার করা হয় পুরুষ স্বজনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে। একজন জানান, তাঁকে ‘টানা ১৮ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়’ এবং এরপর তার বাবার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি দেখেন তাঁর বাবা একটি জিজ্ঞাসাবাদ চেয়ারে বসে আছেন, হাত পেছনে বাঁধা। তিনি বলেন, ‘আমি ঢোকার সময় তারা আমার চোখের বাধন খুলে দেয়, আর আমার হাত সামনে বাঁধা ছিল। আমাকে দেখে আমার বাবা অনেক কাঁদতে শুরু করেন। আমি তাঁর দিকে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরি, তখনো আমার হাত বাঁধা ছিল। তিনি আমাকে বারবার চুমু দিচ্ছিলেন এবং সান্ত্বনার কথা বলছিলেন...তাঁকে ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল।’
গণহত্যা শুরুর পর থেকে পরিবার-পরিজনের সাক্ষাৎ বন্ধ থাকায়, এসব বন্দিদের জন্য বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনজীবীদের বিরল সাক্ষাৎ। এই পরিস্থিতি জরুরি জনমত গঠন ও বৈশ্বিক সম্মিলিত প্রতিবাদের দাবি জানায়। স্কুলপড়ুয়া থেকে শুরু করে দাদি-নানী পর্যন্ত নারীদের এই অমানবিকীকরণ যেন স্বাভাবিক হয়ে না ওঠে—বিশ্বকে তা প্রতিরোধ করতে হবে।

ভারতের তেল শোধনাগারগুলো সীমিত পরিমাণ ইরানি তেল কিনছে। আর এই ক্রয়ের ক্ষেত্রে তারা ইরানকে চীনা ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করছে। মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল থাকার সুযোগেই ভারত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে আইসিআইসিআই
২৬ মিনিট আগে
বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় বর্মার স্থলাভিষিক্ত হতে চলেছেন দেশটির সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী। দীর্ঘদিন পর ভারতের কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানোর এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
১ ঘণ্টা আগে
উত্তরপ্রদেশের কানপুরে এক বীভৎস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। পারিবারিক কলহ ও সন্দেহের জেরে ৪৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তাঁর ১১ বছর বয়সী দুই যমজ কন্যাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছেন। আজ রোববার স্থানীয় সময় ভোরে কানপুরের একটি ফ্ল্যাটে এই ঘটনা ঘটে।
২ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য নতুন দফার আলোচনা শুক্রবারের আগেই অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের দুটি নিরাপত্তা সূত্র। এই বিষয়টি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল যখন, ইরান বলছে—যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার জন্য এখনো কোনো দিন-তারিখ নির্ধারিত হয়নি। তবে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনায় বেশ অগ্রগতি
২ ঘণ্টা আগে