Ajker Patrika

প্যারাগুয়েতে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে ৩০ লাখ লোকের আমানত স্থগিত, প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ ঘোষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১১: ৪২
প্যারাগুয়েতে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে ৩০ লাখ লোকের আমানত স্থগিত, প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ ঘোষণা
সান্তিয়াগো পেনা। ছবি: এএফপি

লাতিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে রাজনৈতিক ও আর্থিক সংকটে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই ঘটনার পর পদত্যাগ করেছেন দেশটির ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয়ে ৩০ লাখ গ্রাহকের আমানত আটকে যায়। এ ঘটনায় ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়াও শুরু হয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উয়েনো ব্যাংক পেনার শাসনামলে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে একটি অপরিচিত ডিজিটাল ব্যাংক থেকে প্যারাগুয়ের অন্যতম বৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ব্যাংকটির দাবি, দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ তাদের গ্রাহক।

গত সোমবার দেউলিয়া হয়ে পড়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উয়েনো ব্যাংককে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর ফলে ব্যাংকটির ৩০ লাখ গ্রাহকের আমানত স্থগিত হয়ে যায়। এতে কয়েক লাখ পরিবার খাবার কেনা ও দৈনন্দিন মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিজেদের অর্থ ব্যবহার করতে পারছে না। এ ঘটনায় ব্যাংকটির নির্বাহীদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং ক্ষুব্ধ গ্রাহক ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন।

২০২৩ সালের আগস্টে ক্ষমতা গ্রহণ করা ৪৭ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ সান্তিয়াগো পেনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। তবে ব্যাংকিং সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপের মুখে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা বিরোধী দল ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের ভেতর ব্যাপক সমর্থন পায়।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় পেনা বলেন, ‘প্রিয় স্বদেশবাসী, আজ আমি আমার জীবনের অন্যতম কঠিন মুহূর্তে আপনাদের উদ্দেশে কথা বলছি। প্যারাগুয়েকে হৃদয়ে ধারণ করে এবং এই বিশ্বাস থেকে যে আমাদের প্রজাতন্ত্রকে সব সময় যেকোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে, আমি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

যেভাবে বড় ব্যাংকে পরিণত হয় উয়েনো

উয়েনো ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে একটি অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ২০২১ সালে প্যারাগুয়ের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক গ্রুপো ভাসকেজ (Grupo Vázquez) প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে পেনার প্রশাসনের অধীনেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পায় এটি।

অনুমোদন পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ করে উয়েনো ব্যাংক। মুদি পণ্য কেনাকাটায় আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক সুবিধা দিয়ে গ্রাহক আকৃষ্ট করার পাশাপাশি প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলের স্পনসর হয় প্রতিষ্ঠানটি। বুধবার জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা একটি চিঠি প্রকাশ করে সরকারের পাশাপাশি বিচার বিভাগের কাছে এ ঘটনায় ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়ার দাবি জানান।

ব্যাংকটি সরকারি ও পেনশনভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৮০ কোটি থেকে ৮৫ কোটি ডলার আমানত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পায়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অবসর তহবিলও রয়েছে। এতে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ওঠে। কারণ, উয়েনো হোল্ডিংয়ের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পেনার আগে শেয়ার মালিকানার সম্পর্ক ছিল।

পেনা দাবি করেন, একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি কেবল ‘বিনিয়োগ’ করেছিলেন এবং ইতোমধ্যে নিজের সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে সরকারি ও পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যাংকটিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তিনি সেগুলোকে তার সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ‘মিথ্যা গণমাধ্যম প্রচারণা’ বলে অভিহিত করেন।

অভিশংসনের উদ্যোগে নিজ দলের নেতারাও

বুধবার বিরোধী দলের আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি পেনার নিজ দল কলোরাডো পার্টির কয়েকজন সদস্যও তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব জমা দেন। ব্যাংকটির পতনের জন্য তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। গত বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত উয়েনো ব্যাংক পরিচালনাকারী গ্রুপের একজন শেয়ারহোল্ডার ছিলেন পেনা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে দেওয়া সতর্কবার্তাও তিনি উপেক্ষা করে আসছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে পেনার ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যায়, যখন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হোরাসিও কার্তেস অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে একটি বার্তা প্রকাশ করেন। কার্তেস লেখেন, ‘সরকারি, বেসরকারি এবং পেনশনভোগীদের অর্থ চুরির পক্ষে আমরা অবস্থান নিতে পারি না। আমাদের জনগণের কথা এবং কলোরাডো পার্টির যে মূল্যবোধ আমরা ধারণ করি, সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার অভিশংসনকে সমর্থন করছি।’

এরপর আরও কয়েকজন আইনপ্রণেতা অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান নেন এবং এ নিয়ে বিতর্ক শুরু করেন। এর মধ্যেই ভিডিও বার্তায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন পেনা। পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো পর্যায়ে যদি আমি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে থাকি, তাহলে তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে আজ আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটিই: যেসব প্যারাগুয়েবাসী আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে নিজেদের সঞ্চয় জমা রেখেছিলেন, তাদের মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করা। আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।’

ব্যাংক কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বিবৃতিতে পেনা বারবার দাবি করে আসছেন, তিনি কোনো ধরনের অন্যায় করেননি।

‘গণতান্ত্রিক যুগের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি’

বিরোধী দলের সিনেটর রাফায়েল ফিলিজোলা ঘটনাটিকে প্যারাগুয়ের গণতান্ত্রিক যুগে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত সবচেয়ে বড় জালিয়াতি বলে অভিহিত করেছেন। ১০২০ এএম রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে তৈরি করা একটি ব্যাংক, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ব্যবসায় সরকারি অর্থ ব্যবহার করা। আর এই পুরো ব্যবস্থার শীর্ষে ছিলেন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই।’

সাবেক অর্থমন্ত্রী পেনা ক্ষমতায় আসার আগে একটি ‘মহান প্যারাগুয়ে’ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আঞ্চলিক রাজনীতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। লাতিন আমেরিকার হাতে গোনা কয়েকজন প্রেসিডেন্টের একজন হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ দেশটির কর্মকর্তারা বারবার পেনাকে ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন সফর করেন পেনা। তবে তার পদত্যাগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প কিংবা রুবিও কেউই কোনো মন্তব্য করেননি।

উত্তরসূরি নিয়ে অনিশ্চয়তা, সিনেটে অভিশংসন প্রস্তাব

পেনার পদত্যাগের পর কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন এবং কখন দায়িত্ব নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, তাঁর পদত্যাগপত্র তাত্ত্বিকভাবে কংগ্রেসের অনুমোদন পেতে হবে। কংগ্রেস পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে উয়েনো ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে আলিয়ানারও জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে। যদিও তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পেনার পদত্যাগের ঘোষণার প্রায় এক ঘণ্টা পর দেশটির নিম্নকক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব অনুমোদন করে। এখন প্রস্তাবটি সিনেটে পাঠানো হবে। সিনেটেও প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে পদত্যাগের পরও পেনা তাঁর সিনেট আসন হারাবেন। এর ফলে এমপি হিসেবে পাওয়া দায়মুক্তি বা আইনি সুরক্ষাও হারাবেন তিনি। তখন তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা হলে সাধারণ আদালতেই বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত