Ajker Patrika

ভারতে জেন-জি বিক্ষোভে আলোচনায় যন্তর মন্তর, নামের পেছনের ইতিহাস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভারতে জেন-জি বিক্ষোভে আলোচনায় যন্তর মন্তর, নামের পেছনের ইতিহাস
১৭২৪ সালে প্রথম যন্তর মন্তরটি নির্মিত হয় দিল্লিতে। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি যন্তর মন্তর শব্দটি ভারতে জেন-জি বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছে। যন্তর মন্তর আসলে কী, এই নামের পেছনের ইতিহাস কী—চলুন জেনে নেই।

ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে যন্তর মন্তর এক অনন্য নাম। পর্যটকদের কাছে এটি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বিজ্ঞান, স্থাপত্য ও ইতিহাসের অসাধারণ সমন্বয়ের প্রতীক। অনেকেই দিল্লি বা জয়পুরের যন্তর মন্তর ঘুরে দেখেন, কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন—‘যন্তর মন্তর’ নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য।

যন্তর মন্তর নামটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে। ‘যন্তর’ শব্দটি এসেছে ‘যন্ত্র’ (Yantra) থেকে, যার অর্থ যন্ত্র বা মেশিন। আর ‘মন্তর’ এসেছে ‘মন্ত্রণা’ (Mantrana) শব্দ থেকে, যার অর্থ পরামর্শ করা বা গণনা করা। দুটি শব্দ একত্রে ‘যন্তর মন্তর’। এর অর্থ দাঁড়ায়—‘গণনার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র’।

নামটির সঙ্গে স্থাপনাটির উদ্দেশ্যেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ যন্তর মন্তর নির্মাণ করা হয়েছিল আকাশের নক্ষত্র ও গ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, সময় নির্ণয়, গ্রহের অবস্থান নির্ভুলভাবে হিসাব করা এবং জ্যোতিষ ও নৌ-পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশে।

মহারাজা সাওয়াই জয় সিংয়ের উদ্যোগ

আঠারো শতকের প্রথম ভাগে জয়পুরের শাসক মহারাজা সাওয়াই জয় সিং দ্বিতীয় উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দির নির্মাণ করেন। ১৭২৪ থেকে ১৭৩০ সালের মধ্যে নির্মিত এসব মানমন্দিরই আজ ‘যন্তর মন্তর’ নামে পরিচিত।

প্রতিটি যন্তর মন্তর একাধিক পৃথক স্থাপনার সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিটি কাঠামো নির্দিষ্ট একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিমাপের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছিল। সূর্যের অবস্থান, সময়, নক্ষত্রের গতিপথ কিংবা আকাশিয় বস্তুর অবস্থান নির্ণয়ের জন্য প্রতিটি যন্ত্রের আলাদা কাজ ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব স্থাপনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক শুধু তাদের আকার নয়, রয়েছে জ্যামিতিক নকশার সাহসী ব্যবহার। বিশালাকৃতির ভাস্কর্যসদৃশ এসব নির্মাণ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের স্থপতি, শিল্পী ও শিল্প-ইতিহাসবিদদের আকৃষ্ট করে আসছে। তাঁদের মতে, এগুলো যেমন বৈজ্ঞানিক উদ্দেশে নির্মিত হয়েছিল, তেমনি এতে রয়েছে অসাধারণ নান্দনিক ও স্থাপত্যশৈলীর প্রকাশ।

কেন এত বড় যন্ত্র

জয় সিং দ্বিতীয়ের মূল লক্ষ্য ছিল আরও নির্ভুল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ করা। সে সময় ব্যবহৃত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলো তাঁর কাছে খুব ছোট এবং যথেষ্ট নির্ভুল মনে হয়নি। ফলে তিনি প্রচলিত যন্ত্রগুলোরই অনেক বড়, স্থায়ী এবং অধিক নির্ভুল সংস্করণ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় যন্তর মন্তরের বিশালাকৃতির স্থাপত্য।

তবে বর্তমানে এসব স্থাপনা থেকে আগের মতো নির্ভুল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। কারণ সময়ের সঙ্গে আশপাশে উঁচু ভবন গড়ে ওঠায় যন্ত্রগুলোর প্রয়োজনীয় দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

কোথায় কোথায় রয়েছে যন্তর মন্তর

ভারতে মোট পাঁচটি যন্তর মন্তর নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে চারটি টিকে রয়েছে।

এগুলো হলো—জয়পুর, দিল্লি, উজ্জয়িনী (উজ্জয়ন) ও বারাণসীতে।

পঞ্চম যন্তর মন্তরটি ছিল মথুরায়। তবে ১৮৫৭ সালের আগে কোনো এক সময় সেখানে অবস্থিত দুর্গসহ মানমন্দিরটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে সেটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

পাঁচটি মানমন্দিরের মধ্যে ১৭২৪ সালে প্রথম যন্তর মন্তরটি নির্মিত হয় দিল্লিতে। এরপর নির্মাণ করা হয় জয়পুরের মানমন্দির, যা পাঁচটির মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে জটিল। পরে তুলনামূলক ছোট আকারে বারাণসী, উজ্জয়িনী এবং মথুরায় একই ধরনের মানমন্দির নির্মাণ করা হয়।

একেকটি যন্তর মন্তর একেক রকম

জয় সিংয়ের প্রকল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো—কোনো যন্তর মন্তর একই রকম নয়। যদিও সব মানমন্দিরে ব্যবহৃত যন্ত্রের বৈজ্ঞানিক নীতিমালা একই, তবু শহরভেদে তাদের আকার, নির্মাণসামগ্রী এবং স্থাপত্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

ফলে দিল্লির যন্তর মন্তর যেমন দেখতে, জয়পুরেরটি তার থেকে অনেকটাই আলাদা। একইভাবে উজ্জয়িনী ও বারাণসীর মানমন্দিরেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।

পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দিল্লি ও জয়পুর

বর্তমানে দিল্লি ও জয়পুরের যন্তর মন্তর সবচেয়ে বেশি পরিচিত এবং পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর অন্যতম কারণ হলো—দুটি মানমন্দিরই ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শহরে অবস্থিত। এ ছাড়া এখানেই জয় সিংয়ের সবচেয়ে বড় আকারের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ করে জয়পুরের যন্তর মন্তরে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এবং সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় যন্ত্র রয়েছে। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস জানতে আগ্রহীদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

বিজ্ঞান ও স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

যন্তর মন্তর শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি আঠারো শতকের ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নত জ্ঞান, প্রকৌশল দক্ষতা এবং স্থাপত্যশৈলীর এক অসাধারণ উদাহরণ।

সংস্কৃত নামের মধ্যেই যেমন এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনি প্রতিটি স্থাপনা প্রমাণ করে—আধুনিক প্রযুক্তি আসার বহু আগে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশ পর্যবেক্ষণে কতটা উন্নত চিন্তাভাবনা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করতেন।

আজও দিল্লি, জয়পুর, উজ্জয়িনী বা বারাণসীর যন্তর মন্তর পরিদর্শনে গেলে শুধু বিশাল স্থাপত্যই নয়, সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাস এবং নির্মাণশৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে। তাই যন্তর মন্তর শুধু অতীতের একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষ্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত