Ajker Patrika

চিন্ময়ের কথা তুলে বাঙালি হিন্দুদের পৃথক রাজ্যের গুরুত্ব বোঝালেন শুভেন্দু

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চিন্ময়ের কথা তুলে বাঙালি হিন্দুদের পৃথক রাজ্যের গুরুত্ব বোঝালেন শুভেন্দু
শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জেলে আটক বাংলাদেশি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের প্রসঙ্গ তুলে বাংলাভাষী হিন্দুদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করায় তীব্র পাল্টা আক্রমণ করেছে সিপিআই (এম)। তাদের অভিযোগ, বিজেপি ‘দ্বৈতনীতি’ অনুসরণ করছে। এ প্রসঙ্গে তারা ছাত্রনেতা উমর খালিদের গ্রেপ্তার ও বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, গতকাল শনিবার রাজারহাট-গোপালপুরে গণেশপূজার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অধিকারী বলেন, পাঁচ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মায়ের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার ছবি সারা বিশ্বের সনাতনীদের নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্বামী প্রণবানন্দের আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা যদি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে না পারতাম, তাহলে আজ আমাদের অবস্থাও হয়তো চিন্ময় কৃষ্ণের মতো হতো।’

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, পরপর বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বাংলাভাষী হিন্দুদের জন্য একটি আবাসভূমি তৈরির আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্বামী প্রণবানন্দের অবদানকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অধিকারী নিজ পরিবারের কষ্টের কথাও তুলে ধরেন। তিনি তাঁর মা গায়ত্রী দেবীর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, তাঁর মায়ের পরিবারের আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের এলাকায়। দেশভাগের সময় হিন্দু হওয়ার কারণে তাঁর মা বাবার সঙ্গে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার নিজের জীবনেও এই যন্ত্রণা রয়েছে। হিন্দু হওয়ার কারণে আমার মাকেও তাঁর বাবার সঙ্গে সবকিছু ফেলে ভারতে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। তাঁরা সঙ্গে করে শুধু পরনের কাপড়টুকু নিয়ে এসেছিলেন।’

তবে সিপিআই (এম) নেতা কলতান দাশগুপ্ত এই যুক্তিকেই বিজেপির বিরুদ্ধে ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেন, দেশের সীমানা যাই হোক না কেন, বামপন্থীরা সবসময় সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিজেপি দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমরা বামপন্থীরা সবসময় সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, বাংলাদেশ, ভারত কিংবা ফিলিস্তিন যেখানেই হোক না কেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু বিজেপি দ্বৈতনীতি অনুসরণ করছে। চিন্ময় কৃষ্ণকে সেখানে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে জেলে রাখা হয়েছে। এখানে উমর খালিদও জেলে রয়েছেন। বিজেপির এই দ্বৈতনীতি মানুষের কাছে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’

রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে যুক্ত এক মামলায় ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কারাগারে আটক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। গত সপ্তাহে তাঁর মা মারা যাওয়ার পর তাঁকে মায়ের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, ‘বাম ও তৃণমূল মানুষকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্বামী প্রণবানন্দের বাংলাভাষী হিন্দুদের জন্য আবাসভূমি নিশ্চিত করার সংগ্রাম ও অবদানের কথা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা সেই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ফিরিয়ে আনতে চাই।’

বিজেপি সরকারের এই রাজনৈতিক বার্তা এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডার, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং দেশভাগ ও বাংলার ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস নিয়ে বড় ধরনের আদর্শিক লড়াই চলছে। অধিকারী তাঁর বক্তব্যে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের বিরুদ্ধেও পুরোনো অভিযোগ নতুন করে তোলেন। তাঁর অভিযোগ, কমিউনিস্ট সরকার বাংলাকে তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

তিনি বলেন, ‘৩৪ বছর বাম শাসন আমাদের পঞ্জিকা, শাস্ত্র, ঐতিহ্য, পুরোহিত, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলির কথা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।’ একইভাবে দুর্গাপূজা ও মহালয়াকেও আদর্শগত যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যে ফেলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও আক্রমণ শানান অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, বিশেষ করে তৃণমূল সরকারের শেষের দিকে পশ্চিমবঙ্গক ‘জামাতাইজ’ বা জামাতিকরণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি দুর্গাপূজার বিসর্জনের সময়সূচিতে পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘তৃণমূল সরকারের সময়ে দুর্গাপূজার সমস্ত নিয়ম ও আচার-অনুষ্ঠানকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং বাংলার দুর্গাপূজাকে জামাতাইজ (জামায়াতে ইসলামি) করার চেষ্টা করা হয়েছিল।’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এ বছরের দুর্গাপূজা প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী হবে এবং সেই অনুযায়ী বিসর্জনও সম্পন্ন করা হবে। তিনি আরও জানান, অষ্টমীর দিন মদের দোকান বন্ধ থাকবে।

অধিকারীর এই বক্তব্যের জবাবে প্রবীণ সিপিআই (এম) নেতা সুজন চক্রবর্তী ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মানুষ কী পড়বেন এবং কীভাবে উৎসব পালন করবেন, তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শারদোৎসব’ পছন্দ হয় না বলেই মনে হচ্ছে। একইভাবে তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ও প্রত্যাখ্যান করছেন।’

সুজন চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘কেউ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেই তিনি কে কোন বই পড়বেন বা কে কী খাবেন, তা ঠিক করে দিতে পারেন না। এত বছর ধরে যেভাবে হয়ে এসেছে, সেভাবেই সবকিছু হবে।’

এই বিরোধের প্রভাব দুর্গাপূজার সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে থাকা বইয়ের স্টলগুলিতেও পড়েছে। অধিকারী বিধানসভায় বলেছিলেন, দুর্গাপূজার মণ্ডপের পাশে বাম দলগুলি মার্কসবাদী সাহিত্যের স্টল দিলে তাদের ‘শারদোৎসব’-এর বদলে ‘দুর্গাপূজা’ শব্দটি ব্যবহার করা উচিত। সিপিআই (এম) এই নির্দেশকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির বক্তব্য, তাদের বইয়ের স্টল ও উৎসব উদ্যাপন আগের মতোই চলবে। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক পরিসরে বিজেপি সরকারের এই হস্তক্ষেপ রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় উৎসব ক্রমেই পরিচয় ও ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবির সংঘর্ষের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

বিজেপির কাছে এই লড়াইয়ের আরেকটি দিক হলো দেশভাগ, বাংলাভাষী হিন্দু পরিচয় এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনৈতিক বয়ানকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা। অন্যদিকে বামপন্থীরা এই বিতর্ককে ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির সংঘাত হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে বিজেপি যে রাজনীতি করছে, সেটিকে আরও বিস্তৃত করে ভারতের অভ্যন্তরে নাগরিক স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে বামপন্থীরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত