Ajker Patrika

দিল্লিতেই ৬ বছরে ৫৪৩ লাশ: ভারতে অগ্নিকাণ্ড কেন এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৪০
দিল্লিতেই ৬ বছরে ৫৪৩ লাশ: ভারতে অগ্নিকাণ্ড কেন এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে
চলতি বছর জুনের শুরুতে দিল্লির মালব্য নগরের একটি গেস্ট হাউসে অগ্নিকাণ্ডে ২১ জনের মৃত্যু হয়। ছবি: পিটিআই

ভারতের বিভিন্ন শহরের বহুতল ভবন, আবাসিক হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে অকাতরে ঝরছে তাজা প্রাণ। আজ বুধবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকার একটি গেস্ট হাউসে ভোরের আলো ফোটার আগে লাগা আগুনে বাংলাদেশিসহ অন্তত ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনার ঠিক দুদিন আগে, ১৭ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে আরেকটি প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডে ৮ জন মারা যান।

এর আগে চলতি বছরের জুনে উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের একটি কোচিং সেন্টারে আগুনে ১৫ জন এবং রাজধানী দিল্লির মালব্য নগরের একটি গেস্ট হাউসে ২১ জনের মৃত্যু হয়। দিল্লির ওই অগ্নিকাণ্ডের পর প্রকাশিত সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে কেবল রাজধানী দিল্লিতেই অগ্নিকাণ্ডে ৫৪৩ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

ক্রমবর্ধমান এসব দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে—কঠোর আইন ও আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন ভারতে অগ্নিকাণ্ড এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে?

এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘কনফ্লুয়েন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ও প্রধান স্থপতি বিনীতা সিঙ্ঘানিয়া এবং ডিজাইন ফোরাম ইন্টারন্যাশনালের (ডিএফআই) প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার আনন্দ শর্মা এসব প্রাণহানির নেপথ্যে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন।

কাগজে-কলমে আইন, বাস্তবায়নে চরম উদাসীনতা

স্থপতিরা বলছেন, ভারতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার প্রধান নির্দেশিকা ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (এনবিসি) যথেষ্ট আধুনিক ও শক্তিশালী। কিন্তু মূল সমস্যা হলো—অনুমোদন পাওয়ার পর তা বাস্তবে প্রয়োগ ও তদারকিতে চরম ব্যর্থতা।

স্থপতি বিনীতা সিঙ্ঘানিয়া জানান, মূলত ফায়ার এনওসি (অনাপত্তি সনদ) পাওয়ার পর থেকেই সমস্যার শুরু। নকশায় দেখানো ইমার্জেন্সি সিঁড়ি, ধোঁয়া বের হওয়ার রাস্তা ও জরুরি নির্গমন পথগুলো ভবন নির্মাণের সময় বা পরে পরিবর্তন করে গুদামঘর বা অতিরিক্ত কক্ষ বানিয়ে ফেলা হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি দিল্লির মালব্য নগরের ফ্লারিশ স্টেজ হোটেলটির কথা তুলে ধরেন। মাত্র ৬টি কক্ষের অনুমোদন নিয়ে বেআইনিভাবে ২৫টি কক্ষ পরিচালনা করা হচ্ছিল সেখানে। ফলে আগুন লাগার পর বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ২১ জন মারা যান।

অন্যদিকে স্থপতি আনন্দ শর্মা জানান, ভবন অনুমোদন, পরিদর্শন এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে কোনো আন্তযোগাযোগ নেই। প্রযুক্তি ও তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে ব্যবস্থার আধুনিকায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

আধুনিক স্থাপত্য ও কাচের দেয়ালের ফাঁদ

আধুনিক ভবনগুলোতে নান্দনিকতার খাতিরে নিচ থেকে ছাদ পর্যন্ত কাচ, কাঠের প্যানেলিং এবং কৃত্রিম ছাদ (ফলস সিলিং) ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আগুনে এগুলো চরম ঝুঁকি তৈরি করে।

স্থপতিদের মতে, বর্তমানে ব্যবহৃত তাপসহনশীল বা লেমিনেটেড কাচ সহজে ভাঙে না। কিন্তু আগুনে ভবনের ভেতরের উত্তাপ বাইরে বের হতে না পেরে কাচের কারণে ভেতরেই আটকে থাকে। এতে ঘরের তাপমাত্রা দ্রুত ‘ফ্ল্যাশওভার’ পর্যায়ে পৌঁছে যায়—যে অবস্থায় কক্ষের ভেতরে থাকা দাহ্য পদার্থগুলোতে একসঙ্গে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া স্থায়ী বা ফিক্সড কাচের দেয়ালের কারণে বিষাক্ত ধোঁয়া বের হতে পারে না এবং উদ্ধারকাজে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ভেতরে ঢুকতে বেগ পেতে হয়।

অগ্নিসংযোগের পথ তৈরি করছে ওয়্যারিং ও এসির অতিরিক্ত চাপ

পুরোনো অনেক ভবনে বর্তমানে অতিরিক্ত এয়ার কন্ডিশনার (এসি), ইন্ডাকশন চুলা ও গিজার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু যে পরিমাণ বৈদ্যুতিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা বা সক্ষমতা থাকার কথা তা ওই পুরোনো তার বা ওয়্যারিংয়ের নেই। ভারতে ২০২৪ সালে এসি ব্যবহারের সংখ্যা যেখানে ছিল ৯ কোটি ৩০ লাখ, ২০৩০ সালে তা দাঁড়াবে ২৪ কোটিতে। তীব্র গরমে বিদ্যুতের এই অতিরিক্ত চাপের কারণে সার্কিট ওভারহিট হয়ে সহজেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটছে।

একই সঙ্গে ভবনের বিভিন্ন তলার ভেতরে রাখা বিদ্যুতের তারের নালী বা ইলেকট্রিক্যাল শ্যাফটগুলো সঠিকভাবে ফায়ারপ্রুফ বা সিল না করার কারণে তা চিমিনির মতো কাজ করে। ফলে এক তলায় আগুন লাগলে তা মুহূর্তের মধ্যেই শ্যাফটের মধ্য দিয়ে ভবনের অন্য সব তলায় ছড়িয়ে পড়ে।

সংকীর্ণ গলি ও ফায়ার সার্ভিসের পৌঁছাতে বাধা

ভারতের শহরগুলোর অপরিকল্পিত নগরায়ণও অগ্নিনির্বাপণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংকীর্ণ প্রবেশ পথ, নিচতলায় গাড়ি পার্কিং বা দোকানপাটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়িগুলো দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। সম্প্রতি কলকাতার হোটেলে লাগা আগুনেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই পারছিলেন না।

দিল্লির পরিসংখ্যান: ৬ বছরে ৫৪৩ লাশ

দিল্লি ফায়ার সার্ভিসের (ডিএফএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত শহরটিতে আগুনে পুড়ে ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ৫৪৩ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৪০৩ জন। কেবল ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই ৬৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কাছে জরুরি ফোনের সংখ্যা ২০১৯-২০ সালের ১৭,২৩১টি থেকে বেড়ে বিগত অর্থবছরে ২০,৩৭৯ টিতে দাঁড়িয়েছে।

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কেবল আইন সংশোধন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নগরায়ণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, ভবনের নিয়মিত ইলেকট্রিক্যাল অডিট এবং বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে ভারতে বহুতল ভবনে আগুনের এমন নির্মম পরিণতি থামানো সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত