Ajker Patrika

ধনকুবের নয়, ভারতে বেশি দান করেন সাধারণ মানুষ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ধনকুবের নয়, ভারতে বেশি দান করেন সাধারণ মানুষ
উত্তর ভারতের একটি মন্দিরের কাছে কয়েকটি দান বাক্স। ছবি: এএফপি

ভারতে দানশীলতা বা পরোপকারের গল্প সাধারণত ওপরের তলা থেকে শুরু হয়। যেখানে থাকে করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) বাজেট, ধনকুবেরদের প্রতিশ্রুতি কিংবা বড় বড় সব ফাউন্ডেশন। কিন্তু অশোক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ফিলানথ্রপির (সিএসআইপি) ‘হাউ ইন্ডিয়া গিভস-২০২৫’ প্রতিবেদন এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ধনকুবের নয়, ভারতে সবচেয়ে বেশি দান করেন সাধারণ মানুষ।

সিএসআইপির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সাধারণ পরিবারগুলো বছরে আনুমানিক ৫৪ হাজার কোটি রুপি (প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার) দান করেন। এর মধ্যে শুধু নগদ টাকা নয়, বরং পণ্যসামগ্রী এবং স্বেচ্ছাশ্রমও অন্তর্ভুক্ত। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো না কোনোভাবে দান করেন। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ দানই খাদ্য, পোশাক বা গৃহস্থালি সামগ্রীর মতো পণ্য হিসেবে দেওয়া হয়। এরপরই রয়েছে নগদ অর্থ (৪৪ শতাংশ) এবং অলাভজনক সংস্থা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাশ্রম (৩০ শতাংশ)।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে সিএসআইপির প্রধান জিন্নি উপ্পল বলেন, ‘ভারত একটি উদার দেশ। আমাদের তথ্য বলছে, সাধারণ পরিবারগুলো জনহিতকর কাজে যতটুকু ভূমিকা রাখে, তা সাধারণত স্বীকৃত হয় না। এই উদারতা ভারতের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।’

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের এই পরোপকার কেবল উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সব আয়ের মানুষের মধ্যে সমানভাবে বিস্তৃত। দানকৃত অর্থের ৪০-৪৫ শতাংশ সরাসরি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ ভারতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই দানের প্রধান কেন্দ্র। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভিক্ষুক এবং নিঃস্ব মানুষের মাঝেও সমপরিমাণ দান করা হয়।

গবেষণার প্রধান কৃষানু চক্রবর্তী বলেন, ৯১ শতাংশ উত্তরদাতার ক্ষেত্রে এই দানের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘ধর্মীয় কর্তব্য’ বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা।

জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার হারের সঙ্গে দান করার প্রবণতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে; বিশেষ করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দানের হার সবচেয়ে বেশি। তবে এটি বিত্তশালীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাসিক চার-পাঁচ হাজার রুপি খরচ করা পরিবারগুলোরও প্রায় অর্ধেক দান করে থাকে।

লিঙ্গভিত্তিক ধরনে দেখা গেছে, পুরুষপ্রধান পরিবারগুলো ধর্মীয় ক্ষেত্রে বেশি দান করে, আর নারীপ্রধান পরিবারগুলো নিঃস্ব ব্যক্তিদের সাহায্যে সামান্য বেশি আগ্রহী।

ভারতের ২০টি রাজ্যের ৭ হাজারের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় নমুনা জরিপের (এনএসএস) ভোগব্যয় তথ্যের সঙ্গে এই উপাত্তের সমন্বয় ঘটিয়ে গবেষকেরা দেখেছেন, মানুষের খরচ করার ক্ষমতা বাড়লে তাঁদের দান করার প্রবণতাও বাড়ে।

পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় ভারতের এই দান করার পদ্ধতি কিছুটা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে ব্যক্তি পর্যায়ে দানের পরিমাণ ছিল ৩৯২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট দানের ৬৬ শতাংশ। তবে উন্নত দেশগুলোতে এই দান সাধারণত নিবন্ধিত এনজিওর মাধ্যমে হয়, যা কর সুবিধার সঙ্গে যুক্ত। ভারতের ক্ষেত্রে এই দান অনেক বেশি সরাসরি এবং অনানুষ্ঠানিক—যাকে বলা হচ্ছে ‘নিচ থেকে উঠে আসা জোয়ার’।

ভারতের পরোপকারের চিত্রটি কেবল ওপরের তলার ধনকুবেরদের গল্প নয়। গবেষকদের মতে, ভারতে উদারতা ওপর থেকে চুঁইয়ে পড়ে না, বরং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক চর্চার মাধ্যমেই এটি টিকে থাকে। প্রতিবেদনটি যে সময় (মার্চ-এপ্রিল) তৈরি করা হয়েছে, তখন বড় কোনো ধর্মীয় উৎসব ছিল না। উৎসবের মাসগুলোতে এই দানের হার আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায় বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত