Ajker Patrika

ইউরোপে চলতি গ্রীষ্মে গতবারের চেয়ে ৩৫ হাজার বেশি মানুষের মৃত্যু, কারণ তাপপ্রবাহ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইউরোপে চলতি গ্রীষ্মে গতবারের চেয়ে ৩৫ হাজার বেশি মানুষের মৃত্যু, কারণ তাপপ্রবাহ
তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে নদী, খালে, বিলে ঝাঁপ দিচ্ছেন মানুষ। ছবি: এএফপি

চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপে পরপর চারটি রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে গত বছরের গ্রীষ্মের তুলনায় অন্তত ৩৫ হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে। মহাদেশটির অর্ধেকেরও কম এলাকার অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বড় তিন দেশ জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনেই এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রাথমিক জাতীয় হিসাবের ভিত্তিতে এই সংখ্যা পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগস্টের পূর্ণাঙ্গ তথ্য যোগ হলে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

মে মাস থেকে পশ্চিম ইউরোপজুড়ে পরপর তাপপ্রবাহ আঘাত হানে। শত শত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বকালের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যায়। ফ্রান্সে জাতীয় গড় তাপমাত্রার হিসাবে সবচেয়ে উষ্ণ দিন রেকর্ড করা হয়েছে। জার্মানিতে জুনের শেষ দিকে টানা তিন দিন তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙে। ওই সময় দেশটির ৪৬টি আবহাওয়া কেন্দ্রে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যায়। স্পেনেও দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। এর ফলে এ ধরনের চরম তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এগুলোর তীব্রতাও বাড়ছে।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু জার্মানিতে

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে জার্মানিতে। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট (আরকেআই) গত সপ্তাহের শেষ দিকে জানিয়েছে, ৬ এপ্রিল থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত আনুমানিক ১৪ হাজার মানুষ তাপজনিত কারণে মারা গেছেন। শুধু ২২ থেকে ২৮ জুনের এক সপ্তাহেই ৯ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আরকেআই।

২০০৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা ইইউর অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর চলতি বছরের জুনের ওই সপ্তাহেই সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর হার দেখা গেছে। তবে ২০২২ সালে কোভিড-১৯ মহামারি তখনও সক্রিয় ছিল।

রেকর্ড রাখা শুরুর পর জার্মানিতে তাপজনিত মৃত্যুর জন্য ২০২৬ সালই সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। এর আগে দেশটিতে সর্বোচ্চ তাপজনিত মৃত্যুর রেকর্ড ছিল ২০১৮ সালে, যখন ৮ হাজার ৯০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আরকেআই জানিয়েছে, স্বাভাবিক গ্রীষ্মে জার্মানিতে তাপজনিত মৃত্যু সাধারণত ২ হাজারের নিচে থাকে।

স্পেনে আগের রেকর্ডও ছাড়িয়েছে

স্পেনের কার্লোস থ্রি হেলথ ইনস্টিটিউটের মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অনুযায়ী, মে মাস থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত দেশটিতে তাপের কারণে ৪ হাজার ৯৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে তাপজনিত মৃত্যুর হিসাবে ২০২৬ সাল স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর হয়ে উঠেছে। এর আগে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড ছিল ২০২২ সালে, যখন ৪ হাজার ৫২০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

তবে বিভিন্ন দেশ তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব ভিন্ন পদ্ধতিতে করে। স্পেন ও জার্মানি তাৎক্ষণিকভাবে মডেল ব্যবহার করে তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব করে। প্রতিদিনের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে কতজনের মৃত্যু তাপের কারণে হয়েছে, তা অনুমান করা হয়।

এ ধরনের হিসাবের প্রয়োজন হয় কারণ মৃত্যুসনদে খুব কম ক্ষেত্রেই সরাসরি ‘তাপ’কে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সাধারণত অতিরিক্ত গরম মানুষের আগে থেকেই থাকা শ্বাসতন্ত্র বা হৃদ্রোগের মতো অসুস্থতাকে আরও গুরুতর করে তোলে। শেষ পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে, স্ট্রোক করে বা কিডনি বিকল হয়ে মারা যেতে পারেন।

তাই মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। ইউরোপের অনেক দেশ এখনো আগস্টের শুরুর দিকের মৃত্যুর হিসাবও প্রকাশ করেনি। জার্মানির সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাখ গত সপ্তাহে বলেছেন, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সংখ্যাগুলো শেষ পর্যন্ত প্রকৃত মৃত্যুর তুলনায় কম বলে প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ফ্রান্সেও ভয়াবহ পরিস্থিতি

ফ্রান্সে ৫০০ টিরও বেশি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। এক পর্যায়ে দেশটির ৯৮ শতাংশ এলাকা তাপপ্রবাহের সতর্কতার আওতায় ছিল। ফ্রান্স প্রথমে সব ধরনের মৃত্যুর ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব প্রকাশ করে। পরে বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে কতজনের মৃত্যু তাপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল, তা নির্ধারণ করা হয়।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা গত সপ্তাহে জানিয়েছে, মে মাসের শেষ দিক থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৩০০। তবে আগস্টের তথ্য তখনও পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক এই হিসাব ইলেকট্রনিক মৃত্যুসনদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা দেশটির মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশের তথ্য ধারণ করে।

ইতালিতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে

ইতালির জাতীয় তাপপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থানীয় পৌরসভাগুলোর তথ্য ব্যবহার করে। ফলে দেশটির পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মৃত্যুর হিসাব প্রকাশে প্রায়ই উল্লেখযোগ্য সময় লাগে। এখন পর্যন্ত ইতালি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ না করে অসম্পূর্ণ তাৎক্ষণিক সূচক দিয়েছে।

মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যেই ইতালিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন বেশি মারা গেছেন। মহামারিবিদরা বলেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে হিসাব সম্পন্ন হলে ইতালিতে তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ৮ হাজারের মধ্যে হতে পারে।

যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে অতিরিক্ত মৃত্যু

ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা জুলাইয়ে জানিয়েছে, তাদের মডেল অনুযায়ী মে ও জুনের তাপপ্রবাহে ইংল্যান্ডে ২ হাজার ৮৭৭ জনের তাপ-সম্পর্কিত মৃত্যু হয়েছে।

বেলজিয়াম জানিয়েছে, ১৮ থেকে ২৯ জুনের মধ্যে দেশটিতে মৃত্যুহার ৩৯ শতাংশ বেড়েছিল। এর অর্থ ওই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত ১ হাজার ২২২ জন মারা গেছেন। নেদারল্যান্ডস জানিয়েছে, ২২ জুন থেকে ৫ জুলাইয়ের মধ্যে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অন্তত ৯০০ জন বেশি মারা গেছেন।

ইউরোপীয় কমিশনের উদ্ধৃত একটি দ্রুত মডেলিং গবেষণায় বলা হয়েছে, জুনের শেষের তাপপ্রবাহের সময় পোল্যান্ডে স্বাভাবিকের তুলনায় আরও ১ হাজার ৭০ জন মারা গেছেন। সুইজারল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, একই সপ্তাহে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২২০। লুক্সেমবার্গ, গ্রিস, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও ডেনমার্কের প্রাথমিক হিসাবেও প্রতিটি দেশে প্রায় ৪০টি করে অতিরিক্ত মৃত্যুর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপের যেসব এলাকায় ৮ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করেন, সেখানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছিল।

জলবায়ু সংকটের সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মে মাসে জানিয়েছিল, গত ২০ বছরে তাদের ইউরোপীয় অঞ্চলে তাপজনিত মৃত্যুহার ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, জলবায়ু সংকটের কারণে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপের বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তীব্র গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও বাড়বে।

চলতি গ্রীষ্মের পরপর চারটি তাপপ্রবাহ সেই ভবিষ্যতেরই একটি ভয়াবহ পূর্বাভাস হয়ে উঠেছে। আর এখন পর্যন্ত পাওয়া ৩৫ হাজারের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাবও চূড়ান্ত নয়। আগস্টের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ প্রকাশিত হলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত