Ajker Patrika

জাপানে ৩৬০ টনের দুর্গ টেনে সরালেন ১৮০০ মানুষ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
জাপানে ৩৬০ টনের দুর্গ টেনে সরালেন ১৮০০ মানুষ
জাপানে ৩৬০ টন ওজনের একটি দুর্গচুড়া টেনে সরিয়েছেন একদল মানুষ। ছবি: সংগৃহীত

জাপানের উত্তরাঞ্চলে ঐতিহাসিক হিরোসাকি দুর্গের ৩৬০ টন ওজনের দুর্গচূড়া (ক্যাসল কিপ) নিজের পুরোনো জায়গার দিকে সরিয়ে নিতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষ অংশ নিয়েছেন। ‘সো-রে, সো-রে’ (যেমনটা আমরা বাংলায় হেঁইয়ো, হেঁইয়ো বলে থাকি) স্লোগান দিতে দিতে তারা ৩০ মিটার দীর্ঘ দড়ি টেনে দুর্গটির অবস্থান দুই মিটারেরও বেশি এগিয়ে নেন।

দুর্গের ভেতরের সুরক্ষিত উঁচু টাওয়ারকে স্থানীয়ভাবে ‘কিপ’ বলা হয়। এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে দুর্গের একটি দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি মেরামতের জন্য কিপটিকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এখন মেরামতের কাজ শেষ হওয়ায় সেটিকে আবার মূল অবস্থানের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আওমোরি প্রিফেকচারের হিরোসাকি দুর্গের কিপটি বিশেষ রেলপথের ওপর বসানো হয়। এরপর, গত শনিবার ৮০ জনের কয়েকটি দল পালা করে দড়ি টেনে ভবনটিকে ১ দশমিক ১৩ মিটার সরিয়ে নেন। রোববার আরও ১ দশমিক ০৯ মিটার সরানো হয়।

হিরোসাকি সিটির পার্ক ও সবুজ এলাকা বিভাগের প্রধান কেনসুকে হায়াসাকা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, গত দুই দিনের এই কর্মসূচিতে ১ হাজার ৮০০ জন লোকের বিপরীতে প্রায় ৮ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত সংখ্যার প্রায় চার গুণ মানুষ অংশ নিতে চেয়েছিলেন। শুধু হিরোসাকি শহর নয়, জাপানের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশ থেকেও মানুষ আবেদন করেন। তাদের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশের মানুষও ছিলেন।

ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের জন্য ভবনটি ভেঙে না ফেলে সরানোর একটি প্রাচীন জাপানি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতির নাম ‘হিকিয়া’। এতে ভবনকে রোলারের ওপর বসিয়ে ধীরে ধীরে সরানো হয়।

২০১৫ সালে হিরোসাকি শহর কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে এই কাজে সরাসরি অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এর ফলে জাপানে প্রথমবারের মতো নাগরিকদের নেতৃত্বে ‘হিকিয়া’ পদ্ধতিতে কোনো ভবন সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো দুর্গ সরাতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

হায়াসাকা বলেন, কিপটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত হওয়ায় সেটিকে ভেঙে ফেলা হয়নি। বরং প্রাচীনকাল থেকে জাপানে ব্যবহৃত ভবন স্থানান্তরের পদ্ধতি ‘হিকিয়া’ ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্গ সংরক্ষণের কাজ এরপরও চলতে থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত দেয়ালটির পুনর্নির্মাণ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। দেয়ালটির মোট ২ হাজার ১৮৫টি পাথর আবার তাদের মূল অবস্থানে বসানো হয়েছে। দেয়ালের কাজ শেষ হওয়ার পর চলতি বছর কর্তৃপক্ষ আবারও সাধারণ মানুষের সহায়তা চায়, যাতে কিপটিকে তার পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া যায়।

৬১ বছর বয়সী মোটোহরু নাকাতা জাপানের একেবারে অন্য প্রান্তের হিরোশিমা থেকে এসেছেন। ১১ বছর আগেও তিনি কিপটি টানার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি সানকেই শিমবুনকে বলেন, আবারও এতে অংশ নিতে পারা তার জন্য অত্যন্ত আবেগের বিষয়। একটি দুর্গ টানার মতো এমন সুযোগ আর কোথাও পাওয়া যায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মানুষের হাতে কিপটি টেনে সরানোর কাজ আগস্টের শেষ পর্যন্ত চলবে। এ সময়ে প্রায় ৪ হাজার ১০০ মানুষ অংশ নিয়ে দুর্গটিকে মোট ৫ মিটার সরানোর কথা রয়েছে। তবে পুরো কাজটি মানুষের শক্তি দিয়ে করা হবে না। এই অংশটি মূলত প্রতীকী এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ঐক্য ও অংশগ্রহণের অনুভূতি তৈরির একটি উদ্যোগ। বাকি প্রায় ৭৩ মিটার দূরত্ব যন্ত্রের সাহায্যে সরানো হবে এবং বছরের শেষ নাগাদ কাজটি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

হিরোসাকি দুর্গের কিপটি বর্তমানে জাপানে টিকে থাকা মাত্র ১২টি ঐতিহাসিক দুর্গ-চূড়ার একটি। উত্তর-পূর্ব জাপানের তোহোকু অঞ্চলে এটিই একমাত্র এমন কাঠামো। দুর্গটি ছিল সুগারু গোত্রের কেন্দ্র। ১৬১১ সালে দুর্গটির নির্মাণ শেষ হয়। তবে মূল কিপটি ১৬২৭ সালে বজ্রপাতের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। বজ্রপাতের আগুন একটি বারুদ রাখার গুদামে ছড়িয়ে পড়লে সেটি বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের সূত্রপাত করে।

বর্তমান কিপটি ১৮১০ সালে পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে হিরোসাকি দুর্গ একটি বড় পার্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে চেরি ফুল ফোটার মৌসুমে পার্কটিতে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ পর্যটক আসেন। চলমান বড় ধরনের সংস্কারকাজের কারণে আগামী কয়েক বছর পর্যটকদের জন্য দুর্গের কিপটি বন্ধ থাকবে। হায়াসাকা বলেন, কিপটি তার মূল ভিত্তির ওপর ফিরিয়ে নেওয়ার পর সংরক্ষণকাজ শুরু হবে এবং পুরো কাঠামোটি ঢেকে রাখা হবে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালে আবার পর্যটকদের জন্য কিপটি খুলে দেওয়ার আশা করা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত