
সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পরই পানি আনতে বের হতে হয় ৪০ বছর বয়সী মমতাকে। এভাবে সারা দিনে আট থেকে দশবার যেতে হয়। হাতে তিনটি খালি প্লাস্টিকের বালতি নিয়ে কয়েক শ মিটার দূরের একটি চাপকলে যান তিনি। এদিকে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি।
উত্তর ভারতের খরা প্রবণ বুন্দেলখন্ড অঞ্চলের উত্তর প্রদেশের জালাউন জেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা মমতা। তিনি জানান, সরকারি পানীয় জল প্রকল্পের আওতায় বসানো কলগুলো দুই বছর ধরে শুকিয়ে আছে। ফলে প্রায় এক হাজার বাসিন্দার গ্রামের অধিকাংশ মানুষকে কয়েকটি চাপকলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
১১ সদস্যের পরিবার ও গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে তাঁর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। তবে তীব্র গরমই তাঁর একমাত্র বাধা নয় বলে জানান তিনি। এর চেয়েও বড় বাধা অতিক্রম করতে হয় তাঁকে। সেটি হলো জাতপ্রথার বাধা।
মমতা ভারতের দলিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বাল্মীকি সম্প্রদায়ের সদস্য। ভারতের শতাব্দীপ্রাচীন জাতপাতের ব্যবস্থায় দলিতদের একসময় ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখনো তাঁরা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হন।
মমতা জানান, গ্রামের প্রভাবশালী জাতের মানুষেরা চাপকল ব্যবহার শেষ না করা পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, ‘তাঁরা সেখানে থাকলে আমরা পানি নিতে পারি না। তাঁরা চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।’
নিম্নবর্ণের কেউ পানি নেওয়ার পর চাপকলটিকে ‘পবিত্র বা শুদ্ধ’ করতে উচ্চবর্ণের কিছু বাসিন্দা সেটির ওপর অতিরিক্ত পানি ঢেলে দেন বলেও জানান মমতা। তিনি বলেন, ‘এটা কয়েক দশক ধরেই চলে আসছে।’
উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত আধা-শুষ্ক অঞ্চল বুন্দেলখন্ড অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই খরা প্রবণ হিসেবে পরিচিত। ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে অঞ্চলটিতে কয়েক দফা বড় ধরনের খরা দেখা দেয়। ভারতে পানির সংকটের প্রতীক হিসেবেও অনেক সময় বুন্দেলখন্ডের নাম উঠে আসে।

বুন্দেলখন্ড মালভূমির পাথুরে ভূপ্রকৃতির কারণে এখানে ভূগর্ভস্থ পানি ধরে রাখা বেশ কঠিন। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পানি সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া হলেও পানির প্রাপ্যতা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এক শতাব্দীর বেশি সময়ের আবহাওয়া–সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, অঞ্চলটির প্রায় সর্বত্র তাপমাত্রা বেড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গ্রীষ্মে বুন্দেলখন্ডের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকেরা বলছেন, তীব্র তাপপ্রবাহ ও পানির সংকট পুরনো সামাজিক ও বর্ণ বৈষম্যকে আরও উসকে দিচ্ছে। সীমিত পানির উৎস ব্যবহারে যখন আরও বেশি পরিবারকে প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে, তখন পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বাধার মুখে থাকা দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষদের বৈষম্যের অভিজ্ঞতাও বাড়ছে।
সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের মিতাশি সিং বলেন, ‘পানি নিয়ে সংঘাত নতুন কোনো বিষয় নয়। যেটি বদলাচ্ছে, তা হলো তীব্র গ্রীষ্ম পানির সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং আগে থেকেই থাকা উত্তেজনাকে আরও তীব্র করছে।’
তবে স্থানীয় প্রশাসন এই অঞ্চলে পানির তীব্র সংকট কিংবা পাবলিক উৎসগুলোতে জাত বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিবিসির মুখোমুখি হওয়া উচ্চবর্ণের বাসিন্দারাও বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে পানির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কথা তাঁরা স্বীকার করেছেন।
পঞ্চাশোর্ধ্ব রাম গোপাল সিং গ্রামের কয়েকটি পরিত্যক্ত কূপ দেখিয়ে বলেন, এই কূপগুলো প্রায় ২০ বছর ধরে শুকিয়ে আছে। পানির অন্য উৎস শুকিয়ে গেছে বা দূষিত হয়ে পড়েছে। নির্ভরযোগ্য পাইপলাইনের সংযোগ না থাকায় আরও বেশি পরিবারকে চাপকলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে সকালে গরম কম থাকায় সে সময় সবাই পানি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এতে কার আগে কে পানি নেবেন এবং একটি পরিবার কতটা পানি নিতে পারবে, তা নিয়ে প্রায়ই তর্কবিতর্ক হয়। তবে রাম গোপাল সিং দাবি করেন, ‘এই চাপকলগুলোতে জাত নিয়ে কোনো বিরোধ নেই।’
তবে বিবিসির সঙ্গে কথা বলা দলিত বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাঁদের ভাষ্য, চাপকলে পানি নেওয়ার কোনো লাইন থাকে না। তাই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে দলিত পরিবারগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পানি নিতে যাওয়ার চেষ্টা করে।
মমতা জানান, তিনি সাধারণত খুব ভোরে বা বিকেলের শেষ দিকে পানি আনতে যান। তিনি বলেন, ‘যেকোনো সময় অপমানিত বা আক্রান্ত হওয়ার ভয় সব সময় মনের মধ্যে থাকে।’
প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের শাহজাহানপুরে শিব একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘উচ্চবর্ণের পরিবারের সদস্যরা চাপকল ব্যবহার করার সময় তাঁর সম্প্রদায়ের কেউ সেখানে যান না। গরম যতই হোক, এক বালতি পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও আমরা অপেক্ষা করি। কারণ আমাদের কোনো বিকল্প নেই।’
গ্রীষ্মকালে যখন পানির চাহিদা আরও বেড়ে যায়, তখন অপেক্ষার প্রহরও দীর্ঘ হয়ে ওঠে বলে জানান শিব। তিনি আরও বলেন, ‘কখনো কখনো পিপাসা নিয়ে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।’
তিন বছর আগে, একটি চাপকলে উচ্চবর্ণের এক বাসিন্দার সঙ্গে কথা কাটাকাটির পর শিবের মা পারমি দেবীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পারমি দেবী বলেন, ‘আমাকে মেরেছিল। তারপর তিনবার মাটিতে আছাড় মারা হয়। এটি কেবল পানি নিয়ে ঝামেলা ছিল না। আমাদের জাত বা বর্ণের কারণেই তারা এটি করেছিল।’

পারমি দেবী মামলা করেছিলেন, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
উত্তর প্রদেশের অলাভজনক সংস্থা ‘দলিত ডিগনিটি অ্যান্ড জাস্টিস সেন্টার’ (ডিডিজেসি)-এর নথিতে এই ধরনের অসংখ্য অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে এই এলাকায় বর্ণভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী পুলিশ ১১৩টি মামলা নথিভুক্ত করেছে।
ডিডিজেসির কুলদীপ সিং বৌদ্ধ বিবিসি হিন্দিকে বলেন, মে ও জুনের তীব্র গরমের মাসগুলোতে পাওয়া অধিকাংশ অভিযোগই পানি সম্পর্কিত ছিল, যদিও সংস্থাটি কোনো বিস্তারিত আলাদা তালিকা প্রকাশ করেনি। তাপপ্রবাহের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে হলে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত সম্প্রদায়গুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখতে হবে।
তবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ কুমার পান্ডের কার্যালয় এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এক বিবৃতিতে কার্যালয়টি বলেছে, ‘এ অঞ্চলে পানির প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে জাত বৈষম্য চর্চার একটি ঘটনাও নেই।’
বিবৃতিতে পানির সংকটের দাবিও অস্বীকার করা হয়েছে। সেখানে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জল জীবন মিশন’-এর কথা উল্লেখ করা হয়। এ প্রকল্পের লক্ষ্য প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া। এ ছাড়া পুকুর পুনরুদ্ধার ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় পূরণের জন্য স্থানীয় পর্যায়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুন্দেলখন্ডের পানিসংকট মোকাবিলায় আরও ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অঞ্চলজুড়ে পুকুর ও চেকড্যামের মতো ঐতিহ্যবাহী জলাধার পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। আবার ‘জল সহেলি’ নামে নারীদের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন দল গ্রামে পানির সরবরাহ পর্যবেক্ষণ ও পানি সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরির কাজ করছে।
তবে জাত ও পরিবেশ রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করা মুকুল শর্মা বলেন, শুধু পানির সরবরাহ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ‘এই অবিচারের মূল কারণ নয়, বরং এটি বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার একটি হুমকি’।
কে পানি ব্যবহারের সুযোগ পাবে তা যদি এখনো জাতপ্রথা দিয়েই নির্ধারিত হয়, তবে শুধু পানি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মত প্রকাশ করেন মুকুল শর্মা।
চাপকলের পাশে দাঁড়িয়ে অন্য পরিবারগুলোর পানি নেওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন মমতা। তাঁর পায়ের কাছে তিনটি খালি প্লাস্টিকের বালতি। মমতা বলেন, শীতকালে দিনে মাত্র কয়েকবার পানি আনলেই হয়। কিন্তু গ্রীষ্মে আট থেকে দশবারের বেশি যেতে হয়। কারা পানি নিচ্ছে সেটার ওপর নির্ভর করে প্রতিবারই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
অবশেষে নিজের পালা এলে বালতিগুলো ভর্তি করে বাড়ি ফেরেন মমতা। আবারও কয়েক ঘণ্টা পরই আবার একই কাজ করতে হয় তাঁকে।

জাপানের উত্তরাঞ্চলে ঐতিহাসিক হিরোসাকি দুর্গের ৩৬০ টন ওজনের দুর্গচূড়া (ক্যাসল কিপ) নিজের পুরোনো জায়গার দিকে সরিয়ে নিতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষ অংশ নিয়েছেন। ‘সো-রে, সো-রে’ (যেমনটা আমরা বাংলায় হেঁইয়ো, হেঁইয়ো বলে থাকি) স্লোগান দিতে দিতে তারা ৩০ মিটার দীর্ঘ দড়ি টেনে দুর্গটির অবস্থান দুই মিটারেরও বেশি
৫ মিনিট আগে
মাত্র ১০ মাসের দায়িত্বে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, বন্ধুত্ব গড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে। নিজের ব্যস্ততা নিয়ে তিনি এমনও বলেছেন...
১ ঘণ্টা আগে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পোশাকের সঙ্গে ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী অতিরিক্ত কোনো পোশাক বা পোশাকের অংশ যোগ করার অধিকার শিক্ষার্থীর নেই বলে স্পষ্ট করেছেন ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত এক স্কুলছাত্রীর করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরান তাঁর এক ছেলেকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। ঘটনাটি কখন বা কোথায় ঘটেছিল, কিংবা তাঁর কোন ছেলেকে লক্ষ্য করা হয়েছিল, তাও জানাননি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
২ ঘণ্টা আগে