Ajker Patrika

প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করলেন জেলেনস্কি, প্রতিবাদে ইউক্রেনজুড়ে বিক্ষোভ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করলেন জেলেনস্কি, প্রতিবাদে ইউক্রেনজুড়ে বিক্ষোভ
জেলেনস্কির প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করার বিরুদ্ধে কিয়েভে বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

ইউক্রেনের জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

কিয়েভে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন তরুণ। তাঁরা ‘ফেদোরভের ওপর থেকে হাত সরাও’ এবং ‘বিজয়কে নস্যাৎ করা বন্ধ করো’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। একই সঙ্গে ‘লজ্জা! লজ্জা!!’ বলে স্লোগান দেন।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এখনো ফেদোরভকে বরখাস্ত করার কারণ প্রকাশ করেননি। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সামরিক মহল এবং নাগরিক সমাজের একটি অংশের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। মাত্র ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভ চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন গতি আনেন, দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ ও উন্নত করতে তথ্যনির্ভর পদ্ধতি চালু করেন বলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।

আজ বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের পার্লামেন্টে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইহর ক্লিমেঙ্কোকে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা ছিল। ফেদোরভের অপসারণের কারণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তাঁর সঙ্গে ইউক্রেনের সেনাপ্রধান ওলেকজান্দর সিরস্কির মতপার্থক্য এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আবার অন্যদের মতে, সেনাবাহিনীর মোবিলাইজেশন বা সেনা সমাবেশ ব্যবস্থার সংস্কারে তিনি প্রত্যাশিত গতিতে অগ্রসর হতে পারেননি।

ফেদোরভকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য ওলেক্সান্দর। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘জেলেনস্কি তাঁর পুরো প্রেসিডেন্সির সময়ে এটিই সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন।’ তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতে তিনি ফেদোরভের দল ও তাঁদের পরিকল্পনার ওপর আস্থা রেখেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁকে বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন, এমন কাউকে আমি চিনি না। না সেনাবাহিনীতে, না সাধারণ মানুষের মধ্যে।’

কিয়েভের কেন্দ্রস্থল ইভান ফ্রাঙ্কো স্কয়ারে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৩১ বছর বয়সী মারিয়া লাভরিনেতস বিবিসিকে বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে আমার অনেক বন্ধু রয়েছে। তাঁদের অনেকেই মারা গেছেন। আমি চাই না এই পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ফেদোরভের কাজের ফল দেখছি। আমরা সৈন্যদের অনুপ্রেরণা দেখছি। আমাদের তাঁদের পক্ষেই দাঁড়ানো উচিত।’

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ফেদোরভ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। ইউক্রেনের অনেকের মতে, মন্ত্রণালয়টি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত আমলাতন্ত্র এবং সোভিয়েত আমলের পুরোনো মানসিকতার মধ্যে আটকে ছিল। ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনবিষয়ক সাবেক এই মন্ত্রী ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবী ‘আইটি আর্মি অব ইউক্রেন’ গঠন করেন। এই বাহিনী রাশিয়ার বিরুদ্ধে সাইবার হামলা পরিচালনা করত।

পরে তিনি ‘আর্মি অব ড্রোনস’ নামে একটি সফল তহবিল সংগ্রহ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। পাশাপাশি যুদ্ধে ‘গেমিফিকেশন’ পদ্ধতি চালু করেন, যার মাধ্যমে রুশ সামরিক সম্পদ ধ্বংসের ভিত্তিতে ইউক্রেনীয় সামরিক ইউনিটগুলোকে ক্রেডিট বা পয়েন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবেও তিনি ড্রোন, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকে তিনি স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ককে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানান। এই পদক্ষেপের ফলে রাশিয়ার সামনের সারির সামরিক অভিযান ও অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

ফেদোরভের মন্ত্রণালয় সম্প্রতি রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ইউক্রেনের হামলাগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গত মাসে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, মধ্যপাল্লার ড্রোন হামলার মাধ্যমে ক্রিমিয়াকে সম্পূর্ণভাবে রাশিয়া থেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ করে দেওয়া হবে।

বরখাস্ত হওয়ার কিছুক্ষণ পর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ফেদোরভ তাঁর বিভিন্ন সাফল্যের তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘অসম কৌশল, উদ্ভাবনের গতি এবং সাংগঠনিক শক্তির মাধ্যমে আমি শত্রুকে পরাজিত করার কাজ চালিয়ে যাব।’ ফেদোরভের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রভাবশালী ব্লগার সেরহি স্টেরনেঙ্কো তাঁকে ‘আমাদের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা প্রতিরক্ষামন্ত্রী’ বলে অভিহিত করেন। স্টেরনেঙ্কো অভিযোগ করেন, গভীরতর সংস্কারের পথে ‘আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং কৃত্রিম বিলম্ব’ সৃষ্টি করা হয়েছিল, যা সংস্কারের অগ্রগতি ব্যাহত করেছে।

এদিকে, খ্যাতিমান ড্রোন ইউনিট কমান্ডার পাভলো ইয়েলিজারভ ফেদোরভকে বরখাস্ত করার প্রতিবাদে ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর উপ-কমান্ডারের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য এক মহা অমঙ্গল’ বলে মন্তব্য করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত