Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রের মতো তাইওয়ানের নেতাদের তুলে নিতে পারবে কি চীন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ১৫
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

চীনা কিছু অনলাইন ব্যবহারকারী তাইওয়ানের নেতাদের ভেনেজুয়েলা ধাঁচের বজ্রগতির অভিযান চালিয়ে ধরে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিশ্লেষক, গবেষক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন—চীনের আধুনিকায়ন পথে সেনাবাহিনী এখনো সে পর্যায়ে প্রস্তুত নয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্লেষক, গবেষক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, তাইওয়ানে চীনের সেনাবাহিনীর সামনে এমন এক প্রতিপক্ষ রয়েছে, যারা বছরের পর বছর ধরে নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো সম্ভাব্য ‘ডিক্যাপিটেশন অপারেশন বা নেতৃত্বশূন্য করার অভিযানের’ বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিয়েছে। এ ছাড়া, তাইওয়ানের রয়েছে বিস্তৃত আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার সক্ষমতা, সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সম্ভাব্য সমর্থন।

যদিও চীন বহু বছর ধরে উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করেছে, তবু সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে এসব সক্ষমতাকে একসূত্রে গাঁথার মতো কমান্ড কাঠামো নিয়েও সন্দেহ আছে। তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পিপলস পার্টির আইনপ্রণেতা চেন কুয়ান-তিং বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযান যদি সমস্যায় পড়ে, তাহলে তা দ্রুতই পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নেবে, যার রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি হবে অত্যন্ত উচ্চ।’

কুয়ান–তিং আরও বলেন, তাইওয়ানের স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এমন যে—তাইওয়ান প্রণালি অতিক্রম করে কোনো আকাশ হামলা বা বিশেষ অভিযানের অনুপ্রবেশ প্রচেষ্টা শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে, যা উত্তেজনার ইঙ্গিত দেবে।

গত সপ্তাহান্তে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাহিনীর যুদ্ধ-পরীক্ষিত আকাশ আধিপত্য প্রদর্শন করেছে। এই অভিযানের সময় স্টেলথ যুদ্ধবিমান, শত্রু প্রতিরক্ষা জ্যাম করতে সক্ষম জেট, এবং গোপন নজরদারি ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কমান্ডারদের কাছে তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করার মাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আকাশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।

চেন কুয়ান–তিং বলেন, এর বিপরীতে পিএলএ–এর ‘যৌথ অভিযানের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা এবং উচ্চঝুঁকির অভিযানের বাস্তব যুদ্ধ-যাচাই—এসব ক্ষেত্রে এখনো স্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে।’ রয়টার্স ফ্যাক্সে এই বিষয়ে জানতে চাইলেও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। বেইজিং দ্বীপটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেনি। তাইওয়ান চীনের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষক কলিন কো বলেন, ‘অপারেশনাল দিক থেকে, পিএলএ সাম্প্রতিক সময়ে শক্তির সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে যা সঞ্চয় করেছে, তার তুলনায় এটি এখনো শিশুতোষ পদক্ষেপ।’

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে গত মাসে বলেন, তাইওয়ান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করবে। বেইজিং সর্বশেষ সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে তাইওয়ানের দিকে রকেট নিক্ষেপ করার পর তিনি এ কথা বলেন। তাইওয়ানকে ঘিরে চালানো ওই মহড়া—যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত—চীনা কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর কঠোর বার্তার সঙ্গে ছিল।

চীনের তাইওয়ান বিষয়ক দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘যে কোনো বহিরাগত শক্তি যদি তাইওয়ান ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করতে বা চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চায়, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির লৌহপ্রাচীরে মাথা ফাটাবে।’ অক্টোবরে লাই ‘টি-ডোম’ নামে এক বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্মোচন করেন।

এটি ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোমের’ মতো হওয়ার কথা, যেখানে আরও শক্তিশালী ‘সেন্সর-টু-শুটার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চতর ধ্বংসক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়। এতে তাইওয়ানে উন্নত স্কাই বো ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহকৃত হিমার্স রকেট সিস্টেম পর্যন্ত বিভিন্ন অস্ত্রের সমন্বয় থাকবে। জুলাইয়ে তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী রাজধানী তাইপেইয়ের প্রধান বিমানবন্দরকে শত্রু অবতরণ থেকে রক্ষার মহড়া চালায়, যেখানে বহনযোগ্য স্টিংগার রকেট ও ট্যাংক মোতায়েন করা হয়।

সামরিক কূটনীতিকরা বলছেন, তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ নিতে নানা সামরিক বিকল্পের অংশ হিসেবে বেইজিং তাইপেইয়ে উদ্ধার অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়ার-গেম চালিয়েছে। এদিকে চীনের কিছু অনলাইন ব্যবহারকারী ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের ঘটনাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে তুলে ধরেছে।

চীনের এক্স-সদৃশ মাইক্রোব্লগিং সাইট উইবোতে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি আমাদের তাইওয়ানকে একীভূত করার একটি সমাধান দেখিয়েছে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘প্রথমে বিশেষ অভিযান চালিয়ে লাই চিং-তেকে গ্রেপ্তার করা হবে, তারপর সঙ্গে সঙ্গে তাইওয়ান দখলের ঘোষণা, নতুন পরিচয়পত্র ইস্যু করা হবে...এবং দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে।’

তাইওয়ানের সংসদের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্য চেন এসব মন্তব্যকে ‘কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেন। অন্য বিশ্লেষকরাও বলেন, এ ধরনের কোনো চেষ্টা খুব দ্রুতই কঠিন সামরিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। কলিন কো বলেন, চীন বোয়িংয়ের ইএ-১৮জি গ্রাউলার ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান এবং নর্থ্রপ গ্রুম্যানের ই-২ডি অ্যাডভান্সড হকআই কমান্ড ও আগাম সতর্কীকরণ বিমানের মতো প্ল্যাটফর্মের অনুকরণে বিমান যুক্ত করেছে। তবে সেগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা এখনো স্পষ্ট নয়।

তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব এখনো পিএলএর কমান্ড কাঠামোয় থাকায় এর কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ রয়ে গেছে। কো সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘একটি বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল কাঠামো অত্যাবশ্যক; এতে মাঠপর্যায়ের কমান্ডাররা পরিস্থিতির প্রবহমান, পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারেন।’

পিএলএর কোনো ঘাটতি থাকলেও তাইওয়ানের নেতারা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ তাইওয়ানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের তাদের হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি যোগ করেন, ‘সবশেষে, এই বেদনাদায়ক ও চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার পর চীনও এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠার নানা উপায় খুঁজবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে দুর্বল পাকিস্তান কীভাবে আধুনিক যুদ্ধবিমান বানাল

ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় ৩৪ বছরের নারীকে খুন ১৮ বছরের তরুণের

বনশ্রীতে স্কুলছাত্রীকে হত্যা: নিজেদের হোটেলের কর্মচারী আটক

অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বনশ্রীর ছাত্রীকে খুন করেন তার বাবার হোটেলের কর্মচারী: র‍্যাব

এমপিওভুক্ততে ৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগের আবেদন শুরু, যোগ্যতা ও আবেদনের নিয়ম

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত