Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর গতিবিধির তথ্য বিক্রি করছে চীনা কোম্পানি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর গতিবিধির তথ্য বিক্রি করছে চীনা কোম্পানি
চীন ওপেন সোর্স ইন্টেল ও এআই ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীর ওপর নজরদারির তথ্য অনলাইনে বিক্রি করছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন। ছবি: সংগৃহীত

চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্মুক্ত উৎসের তথ্য তথা ওপেন সোর্স ইন্টেল ব্যবহার করে ইরান যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চলাচল নজরদারি করছে। এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। এই বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রমশ নজরদারির ঝুঁকি নিয়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক প্রতিষ্ঠান এমন গোয়েন্দা সরঞ্জাম বাজারজাত করছে, যেগুলো দাবি করছে—তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর চলাচল ‘তুলে ধরতে’ পারে। অথচ একই সময়ে বেইজিং প্রকাশ্যে এই সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে স্যাটেলাইট ছবি, ফ্লাইট ট্র্যাকার এবং জাহাজ চলাচলের তথ্যসহ উন্মুক্ত ডেটা একত্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মোতায়েনের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তৈরি করছে। পাঁচ সপ্তাহ আগে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই প্রবণতা দ্রুত গতি পেয়েছে।

অনলাইনে এমন সব পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীর গতিবিধি, যুদ্ধবিমানের অবস্থান এবং সামরিক ঘাঁটির কার্যক্রমের সূক্ষ্ম তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা এক নতুন গোয়েন্দা বাজারের ইঙ্গিত। এই খাতে যুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনের সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, এগুলো বেইজিংয়ের বৃহত্তর কৌশলের অংশ—যেখানে বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে। এই ‘সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন’ কৌশলের অধীনে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগও রয়েছে উল্লেখযোগ্য। এই হুমকি কতটা গুরুতর, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এসব সরঞ্জাম বাস্তবে প্রতিপক্ষরা ব্যবহার করছে কি না। আবার অন্যরা সতর্ক করছেন, প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা ভবিষ্যতের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেনা চলাচল গোপন রাখা কঠিন করে তুলতে পারে। মার্কিন থিংক ট্যাংক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজের ফেলো রায়ান ফেডাসিউক বলেন, ‘চীনে বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান দক্ষ ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তার চীনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে এবং সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা শক্তিশালী করবে।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে তারা পশ্চিমা ও চীনা তথ্যসূত্রের মিশ্রণ এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করে রিয়েল-টাইমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম নজরদারি করতে পারে। আরেকটি কোম্পানি জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিমানের যোগাযোগ বিশ্লেষণ এবং বড় আকারের সামরিক চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের উত্থান আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন।

একসময় ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স সীমিত কিছু বিশ্লেষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন এআই-এর সহায়তায় তা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, ফলে বেসরকারি সংস্থাগুলোও এমন অন্তর্দৃষ্টি তৈরি করতে পারছে, যা আগে শুধু সরকারগুলোর হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

হাংঝৌভিত্তিক মিজারভিশন নামের একটি কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, নৌবাহিনীর গতিবিধি ট্র্যাক করা এবং নির্দিষ্ট বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান শনাক্ত করার দাবি করেছে। তাদের প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী জড়ো হওয়ার বিস্তারিত তথ্য দেখা যায়। এতে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ বিমানবাহী রণতরীর গতিবিধি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ইসরায়েলের ওভদা, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এবং কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে কী ধরনের বিমান জমা হচ্ছিল—তার বিশ্লেষণও প্রকাশ করা হয়।

মিজারভিশন দাবি করেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র ও সরঞ্জামের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীর জ্বালানি সরবরাহের ধরনও “উন্মোচন” করেছে।

আরেকটি প্রতিষ্ঠান, জিং’আন টেকনোলজি, দাবি করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমানের যোগাযোগ সংকেত ধরতে পেরেছে এবং এআই-এর মাধ্যমে তা বিশ্লেষণ করেছে। পরে তারা এই রেকর্ড মুছে ফেলে। তারা আরও দাবি করে, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ জাহাজ ও বিমান সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ১০০ টির বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বহু সামরিক বিমান এবং এক লাখেরও বেশি সামরিক চলাচল শনাক্ত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারাও এ নিয়ে উদ্বেগ জানাতে শুরু করেছেন। মার্কিন কংগ্রেসের চীনবিষয়ক কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সিসিপি বা চায়না কমিউনিস্ট পার্টি–সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এআইকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রের নজরদারি সরঞ্জামে পরিণত করছে।’

অন্যদিকে, বেইজিং প্রকাশ্যে কৌশলগতভাবে এই সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। চীন যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে, তবে সরাসরি জড়িত হওয়া এড়িয়ে যাচ্ছে—যদিও তাদের বেসরকারি খাত এই যুদ্ধকে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত কৌশল চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে না ঢুকেও কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গোয়েন্দা সক্ষমতা সরবরাহ করতে পারে, আর একই সঙ্গে চীনা সরকার ‘দায় এড়ানোর’ সুযোগও পায়। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বড় এক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে। বাণিজ্যিক প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, বেসামরিক ও সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের সীমারেখা তত ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে—যা গোপন সামরিক কার্যক্রম বজায় রাখাকে আরও জটিল করে তুলছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ইলন মাস্কের হাত থেকে বাঁচাতে’ কিশোরী কন্যাকে হত্যা করলেন মা

অবশেষে অনশনরত স্বামীর হাত ধরে ঘরে ফিরলেন সেই স্ত্রী

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না

ভূপাতিত বিমানের দ্বিতীয় ক্রুকে উদ্ধারের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, তবে ইরান থেকে বের হতে পারেনি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত