
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথ্য দিচ্ছেন ‘পুরোনো বন্ধু’ চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। বেইজিং এমন এক সময়ে নিজেকে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, যখন বিশ্ব বাণিজ্য উত্তেজনা, যুদ্ধ এবং জ্বালানি সংকটে কাঁপছে। চীন–রাশিয়া পুতিনের এই দুই দিনের সফরকে তাদের ‘সব সময়ের অংশীদারত্ব’—এর আরেকটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিন গত শুক্রবার জানায়, এই সফরে ভ্লাদিমির পুতিন আশা করছেন, তিনি সি চিনপিংয়ের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর নিয়েও আলোচনা করবেন। ট্রাম্প-সি বৈঠক ছিল রাজকীয় আয়োজন আর প্রদর্শনীতে ভরা। কুচকাওয়াজরত সেনা, গোপন উদ্যান পরিদর্শন, সবই ছিল সেই সফরের অংশ।
তবে বন্ধ দরজার আড়ালে সি ট্রাম্পকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, চীনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু তাইওয়ান নিয়ে কোনো ভুল পদক্ষেপ সংঘাতের দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিতে পারে। ট্রাম্প যখন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায়িক সাফল্য খুঁজছিলেন—যেমন বোয়িং উড়োজাহাজ বিক্রির চুক্তি—তখন সি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি সমঝোতার কথা বলছিলেন। ট্রাম্প–সি বৈঠকে ইরানের যুদ্ধ বন্ধেও যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার বিষয়ে চীনের কোনো প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ট্রাম্প ছিলেন রাষ্ট্রীয় সফরে। অন্যদিকে পুতিন আছে সরকারি সফরে। ফলে কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা ও প্রোটোকলে পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, খুব বেশি পার্থক্য দেখা যায়নি। পুতিনকে স্বাগত জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ট্রাম্পের মতোই তাঁর জন্যও বিছানো হয়েছিল লালগালিচা।
চীন–রাশিয়া পুতিনের এই দুই দিনের সফরকে তাদের ‘সব সময়ের অংশীদারত্ব’—এর আরেকটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। এটি পুতিনের ২৫ তম চীন সফর। একই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলো বেইজিংকে চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা মস্কোকে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে প্রভাবিত করে। চীন নিজেকে এই সংঘাতে শান্তি মধ্যস্থতাকারী ও নিরপেক্ষ পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করলেও পুতিন বলছেন, চীন ও রাশিয়া একে অপরের ‘মূল স্বার্থ’ সমর্থন করে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে আরও জ্বালানি চুক্তি এগিয়ে নিতে চাইছেন পুতিন।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস–ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক ইয়ান স্টোরি বলেন, ‘সি-পুতিন বৈঠক বিশ্বকে এই বার্তাই দেবে যে, চীন-রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারত্ব দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে আছে এবং তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরির যেকোনো মার্কিন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবেই।’
এই সফর হচ্ছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরের পরপরই। সেই সফরে ইতিবাচক কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি হলেও বড় কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি হয়নি। সি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতার’ সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়কার ‘কৌশলগত প্রতিযোগিতা’র ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানান।
বিদেশি নেতাদের আতিথ্য দিয়ে চীন নিজেকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে হিমশিম খাচ্ছে এবং ইরানকে ঘিরে আরেকটি সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রীয় সফরের সময় বেইজিং পশ্চিমা বাণিজ্য অংশীদারদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান হুমকি নয়। একই সঙ্গে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঝুঁকিগুলোকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করে। ট্রাম্পের চীন সফরের পর হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, বৈশ্বিক ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্য ‘স্থিতিশীলতা’ বাড়াবে এমন বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
একই সময়ে রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা বেইজিংয়ের সেই বার্তাকেও জোরদার করে যে তাদের কূটনীতি ধারাবাহিক ও স্থির, এবং পশ্চিমা চাপের কারণে তারা তাদের কৌশলগত অংশীদারদের থেকে দূরে সরে যাবে না। ইয়ান স্টোরি বলেন, ‘সি পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চাপ দেবেন, এমনটা আশা করা অবাস্তব। পুতিনের ওপর শির সেই ধরনের প্রভাব নেই। তা ছাড়া চীনারা বোঝে, ইউক্রেনে রাশিয়ার পরাজয় পুতিনের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সে কারণে বেইজিং জাতিসংঘে মস্কোকে কূটনৈতিক সুরক্ষা, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর জন্য দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।’
চীন বলছে, তারা কখনোই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কোনো পক্ষকে প্রাণঘাতী অস্ত্র দেয়নি এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানিতে তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন গত সোমবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এই সফরে দুই রাষ্ট্রপ্রধান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব ক্ষেত্রের সহযোগিতা এবং পারস্পরিক উদ্বেগের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময় করবেন।’
এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুতিনের সর্বশেষ সফরের সময় রাশিয়া ও চীন ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে সম্মত হয়েছিল। তবে এখনো গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে দুই পক্ষ একমত হতে পারেনি। ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ উৎস হিসেবে রাশিয়ার পক্ষে যুক্তি জোরালো করতে পারে। তবে বেইজিংভিত্তিক এক জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মতে, চীন একই সঙ্গে তুর্কমেনিস্তান ও রাশিয়ার সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গিয়ে উৎস বৈচিত্র্যের কৌশল ধরে রাখবে।
ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, চীন রাশিয়ার সঙ্গে বার্ষিক সরবরাহের পরিমাণ, সরবরাহে নমনীয়তা ও মৌসুমি শর্ত নিয়ে একটি বিস্তৃত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। তবে মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি পরে খোলা রাখা হতে পারে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।
মূল্য নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। ২০১৪ সালে সি চিনপিং তুর্কমিনিস্তানের বিশাল গালকিনিশ গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তর-পশ্চিম চীনে গ্যাস সরবরাহের জন্য চতুর্থ পাইপলাইনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান হয়ে যাওয়া এই প্রকল্পটি এখনো মূল্য বিরোধ ও জটিলতার কারণে চূড়ান্ত হয়নি।
চীন এখনো রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এর মধ্যে পাইপলাইনে আসা তেল এবং সমুদ্রপথে পাঠানো চালান দুটোই রয়েছে। রাশিয়ার তেলের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চীনের স্বাধীন পরিশোধন কোম্পানিগুলো নিয়মিত ক্রেতা হিসেবে রয়েছে। বেশির ভাগ লেনদেনই হচ্ছে চীনা ইউয়ানে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সাময়িক ছাড় পাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধন কোম্পানিগুলোও সম্প্রতি আবার রুশ তেল কেনা শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে রাশিয়া কাজাখস্তানের মাধ্যমে চীনে বছরে অতিরিক্ত ২৫ লাখ মেট্রিক টন তেল সরবরাহে সম্মত হয়েছে। পুতিন ৯ মে সাংবাদিকদের বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা তেল ও গ্যাস খাতে সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ, বরং অত্যন্ত বড় ধরনের অগ্রগতির বিষয়ে উচ্চমাত্রার ঐকমত্যে পৌঁছেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি আমরা সফরের সময় এগুলো চূড়ান্ত করতে এবং বাস্তবায়নের দিকে নিতে পারি, তাহলে আমি খুবই সন্তুষ্ট হব।’
তথ্যসূত্র: রয়টার্স

লেবাননে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এই ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। দেশটিতে গত মার্চে ইসরায়েল আগ্রাসন শুরুর পর এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত...
১ ঘণ্টা আগে
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ অবসানের আলোচনার অংশ হিসেবে রাশিয়ার কাছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নেই। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৯ মে) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি এই কথা জানান।
৮ ঘণ্টা আগে
হরমুজ প্রণালি বরাবরই ইরানের অন্যতম শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র। এত দিন এই জলপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার খবর শোনা যেত। তবে চলমান সংঘাতের জেরে এবার বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
৯ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মঙ্গলবার (১৯ মে) ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই দফায় ইরানের একটি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান, কয়েকটি ছায়া কোম্পানি এবং তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পরিবহনে ব্যবহৃত ১৯টি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
১২ ঘণ্টা আগে