Ajker Patrika

সরকারের নীতিতে উদ্বেগ, বিদেশে পুঁজি সরাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ ধনী হার্তোনো পরিবার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সরকারের নীতিতে উদ্বেগ, বিদেশে পুঁজি সরাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ ধনী হার্তোনো পরিবার
ইন্দোনেশিয়ার যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে ভিক্টর হার্তোনো (বামে)। ছবি: সংগৃহীত

ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে ধনী হার্তোনো পরিবার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া ও প্রেসিডেন্ট প্রাবো সুবিয়ান্তোর সরকারের বিভিন্ন নীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ার মধ্যে বিদেশে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে থাকা পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় নয়টি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অন্তত ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে বিনিয়োগ করেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, হাতার্নো পরিবারের প্রতিষ্ঠান এভারগ্রিন হিল এন্টারপ্রাইজ পিটিই ২০২৩ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষায়িত কাগজ ব্যবসা ৬৬৯ মিলিয়ন ডলারে কেনে। পরের বছর প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রিয়ার একটি সিগারেটের কাগজ প্রস্তুতকারক কোম্পানি কিনতে ৩৬০ মিলিয়ন ইউরো বা ৪১৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। পরিবারটি সিঙ্গাপুরের একটি আর্থিক সেবা সফটওয়্যার কোম্পানিতেও বিনিয়োগ করেছে এবং আরও চুক্তি বিবেচনা করছে।

প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হার্তোনোরা ঐতিহ্যগতভাবে তাদের সম্পদের বড় অংশ ইন্দোনেশিয়ায় রেখেছে। তাদের ব্যবসার মধ্যে রয়েছে দেশটির অন্যতম লাভজনক ব্যাংক ব্যাংক সেন্ট্রাল এশিয়া, জারুমের (Djarum) সিগারেট ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট, বৈদ্যুতিক গাড়ি, পাম তেল, দুগ্ধ খামার ও রেস্তোরাঁ।

বিদেশি অধিগ্রহণে পরিবারের নাম সামনে রাখা হয়নি। নথি অনুযায়ী, এভারগ্রিন হিলের একমাত্র মালিক পিটি এরাগ্রাহা পিরান্তিমেগাহ। এই প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি হার্তোনো পরিবারের মালিকানাধীন। পরিবারটি এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি। ব্লুমবার্গের সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিদের মতে, বিদেশে বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো আয় বিভিন্ন দেশে ও মুদ্রায় ছড়িয়ে দেওয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।

প্রাবো সরকারের নীতিতে উদ্বেগ

২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রাবো ক্ষমতায় আসার পর ইন্দোনেশিয়া থেকে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। চলতি বছর বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা নিট হিসাবে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ইন্দোনেশীয় শেয়ার বিক্রি করেছেন, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের প্রায় চারগুণ। বিদেশি ব্যাংকগুলোও প্রাবো ক্ষমতায় আসার পর ৬৪০ মিলিয়ন ডলার মূলধন ফিরিয়ে নিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতীকে সরিয়ে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পেরি ওয়ারজিয়োর পদত্যাগ বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। প্রাবোর উদ্যোগে গঠিত সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারা দেশের প্রায় সব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে একত্র করায় সরকারের অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের (Verisk Maplecroft) এশিয়া বিশ্লেষক লরা শোয়ার্টজ বলেন, সরকারের অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রশাসনের আচরণ বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কমাচ্ছে না।

সরকার অবশ্য বলছে, তারা সব বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্য ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

হার্তোনোদের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন

প্রাবোর বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচির জন্য চলতি বছর প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি মালিকানাধীন পাম তেল বাগান দখলের উদ্যোগ এবং ধনীদের বাজারদরের নিচে প্যাট্রিয়ট বন্ড কেনার আহ্বান নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। গত বছরের আগস্টে দানান্তারা দেশের ১০ ধনী পরিবারকে প্যাট্রিয়ট বন্ড নিয়ে আলোচনায় ডাকে। রবার্ট বুদি হার্তোনো ও তাঁর বড় ছেলে ভিক্টর হার্তোনো সরাসরি বৈঠকে না গিয়ে প্রতিনিধি পাঠান। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তাদের অনুপস্থিতিকে প্রাবো অসম্মান হিসেবে দেখেছিলেন।

এর কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষমতাসীন জোটের ন্যাশনাল অ্যাওয়েকেনিং পার্টি অভিযোগ করে, ২০০২ সালে ব্যাংক সেন্ট্রাল এশিয়া কেনার সময় হার্তোনো পরিবার সরকারকে কম অর্থ দিয়েছিল। দলটি পরে দানান্তারার মাধ্যমে ব্যাংকের অংশীদারত্ব ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়। দানান্তারা প্রধান রোসান রোয়েসলানি অবশ্য বলেন, এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।

পরে কর তদন্তের অংশ হিসেবে ভিক্টর হার্তোনোকে সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে তিনি মুক্তি পান ও পাসপোর্ট ফেরত পান। এ সময় ব্যাংক সেন্ট্রাল এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে ২০২৫ সালে ব্যাংকটির শেয়ার ১৭ শতাংশ এবং চলতি বছর আরও ১৮ শতাংশ কমেছে।

ইন্দোনেশিয়ার সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড ল স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ভিমা ইউদিস্তিরা অধিনেগারা বলেন, হার্তোনো পরিবারের ঘটনা দেখিয়েছে যে প্রশাসন দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকেও সরকারের অগ্রাধিকার মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে। আইনি নিশ্চয়তা ও আইনের শাসন ছাড়া এ ধরনের চাপ অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা ইন্দোনেশিয়ায় বিনিয়োগে আরও সতর্ক হবেন।

বিদেশমুখী হচ্ছেন অন্য ধনীরাও

হার্তোনো পরিবারই একমাত্র পরিবার নয়। ধনকুবের অ্যালেক্স রামলির প্রতিষ্ঠান মে মাসে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে অস্ট্রেলিয়ার একটি কয়লা খনি কেনার চুক্তি করেছে। ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় ধনী প্রাজোগো পাংগেস্তুর নিয়ন্ত্রিত একটি কোম্পানি জুলাইয়ে ফিলিপাইনের একটি ভূ-তাপীয় জ্বালানি কোম্পানি কিনতে ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে।

হার্তোনো পরিবারের সম্পদের মূল ভিত্তি জারুমের লবঙ্গযুক্ত সিগারেট ব্যবসা। তবে সিগারেট শিল্পকে ভবিষ্যতে পতনশীল খাত হিসেবে বিবেচনা করে পরিবারটি বৈদ্যুতিক গাড়ি, পাম তেল ও অনলাইন বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে চীন থেকে ১৮০০-এর দশকে ইন্দোনেশিয়ায় আসা পরিবারটি ডাচ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে জাপানি দখলদারিত্ব পর্যন্ত নানা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও ব্যবসা ধরে রেখেছে। ভিক্টর হার্তোনোর ভাষায়, ‘যেই ক্ষমতায় থাকুক, আমরা নিজেদের মানিয়ে নিয়েছি। এটাই আমাদের পরিবারের গল্প।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত