Ajker Patrika

সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুর গুজরাটে আম্বানির চিড়িয়াখানায়

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা 
সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুর গুজরাটে 
আম্বানির চিড়িয়াখানায়
রিংটেইল লেমুর

গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া বিপন্ন প্রজাতির তিনটি রিংটেইল লেমুরের দুটিকে ভারতের গুজরাটে পাওয়া গেছে। শীর্ষ ধনকুবের অনন্ত আম্বানির বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ প্রকল্প ‘বনতারা’য় রয়েছে প্রাণী দুটি। একাধিক হাত ঘুরে লেমুর দুটি সেখানে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

চুরি হওয়া লেমুর দুটি দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে প্রাণী দুটির শরীরে কোনো মাইক্রোচিপ, স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বর বা সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইল না থাকায় সেগুলোর মালিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করে ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

‘বনতারা’ ভারতের শীর্ষ শিল্প-বাণিজ্য গোষ্ঠী রিলায়েন্সের মালিকানাধীন। সাড়ে তিন হাজার একর জমিতে গড়ে ওঠা বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রের অংশ এটি। আরও আগে চালু হলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৫ সালের মার্চে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। রিলায়েন্সের চেয়ারম্যান ও এমডি শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্ত আম্বানি এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে।

সিআইডির তদন্ত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে লেমুর চুরি ও পাচারের এই তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ গভীর রাতে সাফারি পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি হয়। এর মধ্যে দুটি পরে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। এই ঘটনায় পরের দিন মামলা করে সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ। মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।

তদন্তে জানা যায়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিযুক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিপেন মাহমুদের সহযোগিতায় জুয়েল নামের এক বন্য প্রাণী চোরাকারবারি লেমুরগুলো চুরি করেন। বস্তায় ভরে একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হয় প্রাণীগুলো। সেখান থেকে ভিডিও ধারণ করে ছবি ভারতীয় সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়। একপর্যায়ে কলকাতার বাবলু ও মুম্বাইয়ের শিপলু নামের দুই ব্যক্তি ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ করেন দেলোয়ার ও তপন নামের দুই ব্যক্তি। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একটি প্রাপ্তবয়স্ক লেমুর ও একটি শাবক ১৭ লাখ টাকায় বিক্রির চুক্তি হয়। আরেকটি শাবকের দাম নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ টাকা।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, স্থানীয় এক সীমান্ত লাইনম্যানের সহযোগিতায় দুটি লেমুরকে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়। এরপর একাধিক ব্যক্তির হাত ঘুরে প্রাণী দুটি গুজরাটের জামনগরে পৌঁছায়। পরে ভারতীয় ক্রেতারা সেগুলো ‘বনতারা’ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করেন।

বনতারায় লেমুর দুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বাংলাদেশের তদন্তকারীদের নজরে আসে বিষয়টি। ছবির সঙ্গে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুরের মিল পাওয়ার পর প্রাণী দুটি দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, পাচার হওয়া বন্য প্রাণীর মালিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাইক্রোচিপ, নিবন্ধন নম্বর কিংবা জেনেটিক প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি সময় সাফারি পার্কে থাকার পরও লেমুরগুলোর ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করা হয়নি। সেখানে কোনো ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি, মাইক্রোচিপ বসানো বা স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থাই ছিল না। এ কারণে গুজরাটের চিড়িয়াখানায় থাকা লেমুর দুটি যে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকেই চুরি হওয়া প্রাণী, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এখনো দেশে থাকা একটি শাবক লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে পাচার হওয়া লেমুর দুটির সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

লেমুর চুরি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক সুনীল দাশ বলেন, ২০১৮ সালের আগস্টে কাস্টমসে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিরল প্রজাতির লেমুর দুটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে আনা হয়েছিল। ধরা পড়লে পরে গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক চক্রের নজরে পড়ে প্রাণীগুলো। একসময় নিরাপত্তাকর্মীর সহযোগিতায় লেমুর চুরি করে সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অধিকাংশ আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দাদের ওই অভিযানে বিরল পাখি ও প্রাণীর একটি বড় অবৈধ চালান জব্দ হয়। এতে বেশ কিছু লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূর এবং এক জোড়া লেমুর ছিল। আটক চালানের একটি অংশ পরে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, পাখি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে লেমুরগুলো দেশে আনা হয়েছিল। পরে সাফারি পার্কে থাকা অবস্থায় এ জোড়া লেমুরের দুটি শাবক জন্ম নেয়। বাবা লেমুরটি মারা যাওয়ার পর মা ও দুটি শাবক পার্কে ছিল।

সিআইডি জানিয়েছে, এ ঘটনায় মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দেলোয়ার ও জহির মিয়া নামের দুই আসামির জবানবন্দি নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁরা গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। তদন্তে জহির মিয়ার বিরুদ্ধে এর আগে ম্যাকাও পাখি চুরির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

২০২৮ সালে লেমুর আমদানি করা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল এএসএইচএ ইন্টারপ্রাইজ। তেজগাঁওয়ের মণিপুরীপাড়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. আতিউল হাফিজ সাদ ফোনে বলেন, ‘সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ব্যবসাটি আমাদের পারিবারিক। কে বা কারা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে লেমুরগুলো আমদানি করেছিল, সেই তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই।’

আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার দ্বীপের স্থানীয় প্রাণী রিংটেইল লেমুর কালো-সাদা বলয়যুক্ত দীর্ঘ লেজের জন্য পরিচিত। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় প্রজাতিটি ‘গুরুতরভাবে বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এটি বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশনের (সাইটিস) পরিশিষ্ট-১-এর অন্তর্ভুক্ত প্রাণী। ফলে বিশেষ শর্ত ছাড়া এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ।

এ বিষয়ে বন্য প্রাণী ও চিড়িয়াখানা বিশেষজ্ঞ মো. রেজা খান বলেন, দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণে নেওয়ার পরই সেগুলোর ডিএনএ প্রোফাইলসহ স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। এতে কোনো প্রাণী চুরি বা পাচার হলে তার পরিচয় ও মালিকানা নিশ্চিত করা সহজ হয়। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে বন্য প্রাণী পাচার ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিশেষ করে সিসিটিভি ও অন্যান্য আধুনিক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে হবে। দেশের ভেতরে বন্য প্রাণী চুরি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত