Ajker Patrika

সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করছে দিল্লি–নেপিডো, মিয়ানমার সফরে ভারতীয় নৌপ্রধান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করছে দিল্লি–নেপিডো, মিয়ানমার সফরে ভারতীয় নৌপ্রধান
মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ে উইন উ ভারতের নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ ত্রিপাঠীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ছবি: ইরাবতী

মিয়ানমারের নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ে উইন উ গত সোমবার ভারতের নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ ত্রিপাঠীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত ৩০ মার্চ সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল কোনো বিদেশি সামরিক নেতার সঙ্গে তাঁর প্রথম বৈঠক। থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্র পরিচালিত গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে দুই পক্ষ যৌথ সামরিক মহড়া, সীমান্তজুড়ে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও ক্রীড়া কার্যক্রমের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।

এই বৈঠকের সময়ই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ভারতের সীমান্তঘেঁষা চিন রাজ্য ও সাগাইন অঞ্চলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এপ্রিলের শেষ দিকে ভারী বিমান সহায়তায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী চিন রাজ্যের ফালাম পুনর্দখল করে। আর নেপিডোতে ওই বৈঠকের একদিন পর মঙ্গলবার উত্তর সাগাইনের মাওলুও পুনর্দখল করে জান্তা বাহিনী।

ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সাগাইন অঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় সক্রিয়। গত বছরের জুলাইয়ে ভারতীয় বাহিনী মিয়ানমারের ভেতরে ড্রোন হামলা চালায় ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম–ইন্ডিপেনডেন্ট বা উলফা-আইয়ের ঘাঁটিতে। হামলাগুলো চালানো হয় নানইউন ও লাহে টাউনশিপে। উলফা-আই উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামকে স্বাধীন রাষ্ট্র করার দাবিতে কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

গত মার্চে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তোলে, ছয় ইউক্রেনীয় ও এক মার্কিন নাগরিক অবৈধভাবে মিয়ানমারে প্রবেশ করে সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। এ সন্দেহে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে খবর প্রকাশিত হয়।

অ্যাডমিরাল ত্রিপাঠীর সফরের সময়ই ৫ শতাধিক কর্মকর্তা ও নাবিক বহনকারী দুটি ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ শুভেচ্ছা সফরে ইয়াঙ্গুনে পৌঁছায়। বৈঠকে জেনারেল ইয়ে উইন উ’র সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন চিফ অব জেনারেল স্টাফ (আর্মি, নেভি অ্যান্ড এয়ার) লেফটেন্যান্ট জেনারেল কো কো উ। তিনি এর আগে ব্যুরো অব স্পেশাল অপারেশনস–১–এর প্রধান হিসেবে চিন ও সাগাইনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।

এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কো কো উ ভারতের সফরে গিয়ে কলকাতায় ইস্টার্ন কমান্ড প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাম চন্দর তিওয়ারির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেটি ছিল সপ্তম আর্মি-টু-আর্মি স্টাফ টকসের অংশ। তখন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল।

গণতান্ত্রিক প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও ভারত ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গত পাঁচ বছর ধরে নেপিডোর জান্তা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এমনকি মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহকারী অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যেও ভারত রয়েছে। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অভিযানের সময় ভারতে পালিয়ে যাওয়া মিয়ানমার সেনাদের ফেরত পাঠাতেও সহায়তা করেছে নয়াদিল্লি।

গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জান্তার বিতর্কিত নির্বাচনের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছিল ভারত। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলাই ভারতের এই ঘনিষ্ঠতার মূল কারণ। গত বছরের আগস্টে মিন অং হ্লাইং চীনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং বিরল খনিজ উত্তোলন সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় বলে জানা যায়।

চার দিনের এই সফরকে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের ‘সবার আগে প্রতিবেশী’, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ এবং ‘মহাসাগর’ নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। এসব নীতিতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়া হয়। দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে নিয়মিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চলে ইন্ডিয়া–মিয়ানমার নেভাল এক্সারসাইজ, ইন্দো–মিয়ানমার কো–অর্ডিনেটেড পেট্রল, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ এবং বন্দর সফরের মাধ্যমে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক এবং ২০১৯ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির ভিত্তিতেই দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পরিচালিত হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত