Ajker Patrika

পশ্চিমবঙ্গে মাদকের চেয়েও বিপজ্জনক বস্তু এখন গরুর মাংস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ৫৫
পশ্চিমবঙ্গে মাদকের চেয়েও বিপজ্জনক বস্তু এখন গরুর মাংস
ছবি: আল-জাজিরা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর গরুর মাংসের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বাজারে বেড়েছে দাম, অনেক রেস্তোরাঁ মেনু থেকে বাদ দিয়েছে গরুর মাংসের পদ। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয়।

এ বিষয়ে আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়—কলকাতার ট্যাংরা এলাকায় শহরের একমাত্র গরু জবাইখানাটি এখন প্রায় জনশূন্য। স্থানীয় একটি খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মেহমুদ আলম বলেন, মে মাসে জবাইখানাটি কার্যত বন্ধ হওয়ার পর স্কুলপড়ুয়া শিশুরা দেয়াল টপকে সেখানে ঢুকে খেলাধুলা করে।

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার গবাদিপশু জবাই নিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করলে গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর ও নির্দিষ্ট ধরনের মহিষ জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের জন্য প্রাণীটির বয়স ১৪ বছরের বেশি হওয়া, কাজ বা প্রজননের অনুপযোগী হওয়া অথবা বয়স, আঘাত, বিকৃতি কিংবা নিরাময়-অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হওয়ার মতো শর্ত রয়েছে। অনুমোদিত প্রাণীও কেবল নির্দিষ্ট পৌর বা অনুমোদিত কসাইখানায় জবাই করা যাবে।

বিজ্ঞপ্তিটির প্রভাব গত ঈদের সময় থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজার ও রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের সংকট দেখা দেয়। তিন মাসের বেশি সময় পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাংস ব্যবসার লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা।

মাংস ব্যবসায়ী মুস্তাক বলেন, তাঁর লাইসেন্স নবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও তা আটকে আছে। তিন মাসের বেশি সময় ধরে তিনি কোনো আয় করতে পারেননি। এদিকে গরুর মাংসের দামও বেড়েছে। কলকাতায় এক কেজি মাংস এখন ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপি, যেখানে আগে দাম ছিল ২০০ থেকে ২৫০ রুপি। এক প্লেট ভুনা মাংসের দামও ১০০ থেকে বেড়ে ১২০ রুপি হয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের উল্লেখযোগ্য গরুর মাংস ভোক্তা রাজ্যগুলোর একটি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির গ্রামীণ ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহুরে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার গরু বা মহিষের মাংস খায়। মুসলিমদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশও গরুর মাংস খান। খ্রিষ্টান, দলিত ও কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রচলন রয়েছে।

কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় কয়েকটি মাংসের দোকানের মালিক জানিয়েছেন, মে মাসের পর তাঁদের ব্যবসায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোকসান হয়েছে। সরবরাহ অনিয়মিত, দাম বেশি এবং মাংসের মানও আগের মতো নেই।

শহরের অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ গত তিন মাসে গরুর মাংসের পদ বন্ধ করেছে। জনপ্রিয় জমজম রেস্তোরাঁর তিন শাখাতেই পদটি বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শাদমান ফাইজ জানান, এতে গ্রাহক কমেছে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ লোকসান হচ্ছে; কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়েছে।

১৯৪৭ সাল থেকে কলকাতার পরিচিত রেস্তোরাঁ ওলিপাবেও গরুর স্টেক এখন নিয়মিত পাওয়া যায় না। ব্যবস্থাপনা সূত্রের ভাষ্য, সরবরাহ থাকলেই পদটি পরিবেশন করা হচ্ছে।

শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের অন্যান্য এলাকাতেও সংকট ছড়িয়েছে। বারুইপুরে বেলা ১১টার মধ্যেই অনেক দিন গরুর মাংস শেষ হয়ে যাচ্ছে। মালদায় আবার গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাংস বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

গরুর মাংসের ব্যবসায়ী আলফাজ লায়েকের ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গে এখন গরুর মাংস বহন করা মাদক বহনের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যসংস্কৃতি থেকে গরুর মাংস একসময় অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত