Ajker Patrika

হামলা বন্ধ করে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ভাঙতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, ফের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হামলা বন্ধ করে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ভাঙতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, ফের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা
ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি এক সংকটের মুখে ফেলে দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে গুঞ্জন উঠছে—ইরানের ওপর লাগাতার যে বোমাবর্ষণ তিনি চালাচ্ছিলেন, তা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে এখন কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার দিকেই পুরোপুরি নজর দেওয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বোমার বদলে অর্থনীতির আঘাত হানার এই পরিকল্পনা সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে ফল দিতে সময় নেবে অনেক বেশি। ফলে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই দেশে জ্বালানি তেলের চড়া দাম আর এক অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ সামাল দিতে গিয়ে চরম রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়ান শঙ্কায় তাঁর দল রিপাবলিকানরা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অর্থনৈতিক হামলা নিয়ে আলোচনা বেশ কম। অথচ তাঁর বোমাবর্ষণের দিকেই নজর সবার বেশি। যদিও মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, তেহরানের শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত এই অর্থনৈতিক আঘাতই বেশি পরাস্ত করবে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও উন্মুক্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো ইরানের ভেতরে গভীর হতে থাকা অর্থনৈতিক সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করছে। এমনকি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেলসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে গ্যাসোলিনের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানিরা চায় বোমাবর্ষণ বন্ধ হোক এবং তাদের অর্থের সংস্থান হোক। তবে বিষয়টি উল্টো। তারা আসলে সবচেয়ে বেশি চায় অর্থ।’

টানা ১৩ দিন আক্রমণের পর সপ্তাহান্তে হামলা সাময়িক স্থগিত করেন ট্রাম্প। তিনি সোমবার জানান, চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে তেহরান। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছেন। দুই পক্ষই এখন মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কথা বলছে। ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের নেতৃত্বে এই মধ্যস্থতাকারীরা সাময়িক বিরতিকে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এমন একটি প্রস্তাব, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ ও যান চলাচলের ব্যবস্থাপনায় ইরান ও ওমানকে কিছুটা কর্তৃত্ব এবং রাজস্ব আদায়ের সুযোগ করে দেবে। এই ব্যবস্থার মূল কাঠামোটি নেওয়া হবে মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালীতে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার যৌথ ব্যবস্থাপনার রূপরেখা থেকে। ট্রাম্প প্রশাসনের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানের এক পক্ষ এটা চায়, আরেক পক্ষ চায় না। সমস্যার মূল সূত্র এখানেই।’

ইরান এমন নিশ্চয়তা চায় যেন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আর কখনো হামলা না চালায়। একই সঙ্গে তারা অর্থ ফেরত চায়—তাদের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা হোক এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক।

প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার জন্য ইরানকে কোনো ধরনের সুবিধা দিতে রাজি নন ট্রাম্প। তিনি উল্টো দাবি করছেন, তেহরানকে তাদের অবশিষ্ট পরমাণুপণ্য সমর্পণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌঅবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে বেশ সময় লাগবে। পূর্ণমাত্রার বোমাবর্ষণের মতো দ্রুত ফল এতে মিলবে না, তবে ট্রাম্প এখনো পূর্ণমাত্রার বোমাবর্ষণের অনুমোদন দেননি।

এই দীর্ঘসূত্রতা রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত এক যুদ্ধ এবং জ্বালানির চড়া দামের পক্ষে সাফাই গাইতে হতে পারে। গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমার ধৈর্য অপরিসীম।’

অপর এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, ইরানিরা তাদের যোদ্ধাদের বেতন দিতে পারছে না বলে অভিযোগ করছে। কেন? কারণ এই তীব্র আর্থিক চাপ। ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের কারণে, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যা করছেন তার কারণে।’ ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, ‘সেখানে ব্যাংক থেকে সব অর্থ তুলে নেওয়ার ধস নামার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এত বড় এক তেলসমৃদ্ধ দেশে গ্যাসোলিনের সংকট চলছে। তারা এখন মার্কিন যুদ্ধ দপ্তরের চেয়ে ট্রেজারি বিভাগকেই বেশি ভয় পাচ্ছে।’

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন মধ্যস্থতাকারী জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের সঙ্গে আগের আলোচনায় ইরানিরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল—অর্থ হাতে পাওয়ার বিষয়টিই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘তারা নগদ অর্থর জন্য স্টিভ আর জ্যারেডের কাছে একপ্রকার অনুনয়-বিনয় করছে। অর্থের জন্য তারা মরিয়া।’

ট্রাম্প প্রশাসন তাদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি পুনর্বহাল করে ১ হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও উড়োজাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর মাধ্যমে ইরানের তেল বাণিজ্য, অনানুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবস্থা, অস্ত্র ক্রয় এবং নৌ-পরিবহন নেটওয়ার্ককে নিশানা করা হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, কূটনীতিকে সুযোগ দিতেই তিনি বোমাবর্ষণ সাময়িক বন্ধ রেখেছেন। তবে এক্সিওস সূত্রের খবর, জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সতর্কবার্তার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। ড্যান কেইন জানিয়েছিলেন, সেন্ট্রাল কমান্ডের মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহে টান পড়ছে।

মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেনারেল কেইনের এই সতর্কবার্তাকে একটি স্বাভাবিক সামরিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, ‘সামগ্রিক অস্ত্রভান্ডার খালি হয়ে যায়নি বা শূন্যে ঠেকেনি। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভান্ডার থেকে অস্ত্র আনার চিন্তা করলে কিছু ঝুঁকি থাকে, আর কমান্ডার-ইন-চিফকে সেটাই জানাতে হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক তিনিই।’

ট্রাম্পের এই যুদ্ধ নীতির সমালোচকরা বলছেন, প্রেসিডেন্টের হাতে এখন ভালো কোনো বিকল্প নেই। সামরিক হামলা কিংবা অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে তাঁর শর্ত মানাতে বাধ্য করা যাবে কি না, তা নিয়ে তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন। ওবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজার্সের বিশ্লেষক ব্রেট এরিকসনের হিসাব মতে, চলতি বছরের প্রথম অর্ধে ইরান তেল খাত থেকে প্রায় ২,৩০০ কোটি ডলার আয় করেছে, যা তাদের বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।

সোমবার এক্সে এরিকসন লিখেছেন, ‘ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই অর্থনৈতিক লড়াই নীতিগতভাবেই একটি ভুল সিদ্ধান্ত।’

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক্সিওসকে বলেন, ট্রাম্প মূলত কূটনৈতিক সমাধানই পছন্দ করেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে বা মিত্রদের ওপর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তবে তিনি সব পথই খোলা রাখছেন। তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সফল নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের অব্যাহত আগ্রাসনের জবাবে টানা ১৩ দিনের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের পর, ইরানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে সমঝোতার দিকে হাঁটা। তা না হলে কী ঘটবে, সেটা তারা ভালো করেই জানে।’

যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের কাছে দুই দিক থেকেই জেতার সুযোগ রয়েছে। সামরিকভাবে পূর্ণ শক্তিতে আক্রমণ চালাতে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সক্ষম, তেমনি ইরানকে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়াতেও তারা সমান পারদর্শী।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত