Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ

ইসলামাবাদ বৈঠক: আলোচনা হলো, ফলাফল নেই

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইসলামাবাদ বৈঠক: আলোচনা হলো, ফলাফল নেই
জে ডি ভ্যান্স ও মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহু কাঙ্ক্ষিত আলোচনা শেষ হয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে টানা ১৪ ঘণ্টার সেই আলোচনা শেষে দুই দেশের প্রতিনিধিদলই গতকাল রোববার দেশে ফিরে গেছে। তাৎক্ষণিক কোনো ঘোষণা বা ফলাফল পাওয়া গেল না ইসলামাবাদ থেকে।

তবে আলোচনা যে হলো এবং কোনো পক্ষই যে আলোচনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়নি, সেটিই এই দফার পাওনা। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান বলেছে, দুই পক্ষকে আলোচনায় ধরে রাখার কাজটা তারা চালিয়ে যাবে। যদিও শিগগির এই আলোচনা যে আবার শুরু হতে পারে তেমন কোনো আভাসও মিলছে না। তারপরও সারা বিশ্ব চাইছে, সংঘাত এড়াতে কূটনীতির এ পথ খোলা থাক। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে অনেক দেশ।

ঐতিহাসিক এই আলোচনার ফলাফল সম্ভবত উঠে এসেছে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের প্রধানদের বক্তব্যে। আলোচনায় ইরানের পক্ষ নেতৃত্ব দেওয়া দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইসলামাবাদ ছাড়ার আগে বলেছেন, ‘আমাদের দিক থেকে সামনে এগোনোর চেষ্টাই ছিল। কিন্তু আস্থা অর্জনের মতো কিছু করতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।’

আর মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতা দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হলো। চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলো ইরান।’

তবে ইরান জানিয়েছে তারা আলোচনা অব্যাহত রাখবে। দেশটির সরকার গতকাল এক এক্স পোস্টে বলেছে, ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে দুই দেশের কারিগরি দল এখন বিস্তারিত প্রস্তাব ও ‘বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের খসড়া’ বিনিময় করছে। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও গুরুত্বপূর্ণ দু-তিনটি বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে বলে জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই। তিনি বলেছেন, ‘এই আলোচনা হয়েছে ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর, যেখানে চারদিকে শুধু অবিশ্বাস আর সন্দেহ। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম বৈঠকে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা আমাদের ছিল না। আর তেমনটি কেউ আশাও করেনি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখবে বলে আশাবাদ জানিয়ে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করায় আমি উভয় পক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। আশা করি, পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে উভয় পক্ষ এ ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখবে।’

দাবিদাওয়া নিয়ে দুই পক্ষ যা বলছে

ইরানি প্রতিনিধিদলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু বিষয় দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট ওই সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালি, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি ও আরও বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী শর্ত তেহরান মেনে নেয়নি।

তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো স্পষ্টভাবে ইরানকে জানিয়েছে। তবে ইরান তাতে রাজি হয়নি।

যুদ্ধ আপাতত বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন। ইরানের রাজধানী তেহরানের রেভল্যুশন স্কয়ারের সামনে ‘ফাঁদ পেতে যুদ্ধবিমান-ক্ষেপণাস্ত্র ধরার’ প্রতীকী ছবিসংবলিত বিশাল বিলবোর্ডের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী।	ছবি: এএফপি
যুদ্ধ আপাতত বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন। ইরানের রাজধানী তেহরানের রেভল্যুশন স্কয়ারের সামনে ‘ফাঁদ পেতে যুদ্ধবিমান-ক্ষেপণাস্ত্র ধরার’ প্রতীকী ছবিসংবলিত বিশাল বিলবোর্ডের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: এএফপি

আলোচনায় কোন কোন বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে, তা জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই। তিনি বলেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আলোচনার মূল বিষয়গুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক ইস্যু, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে ও এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান।

ইসলামাবাদে আলোচনা শেষ হওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এ দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এক্সে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা ছিল। কিন্তু আগের দুটি যুদ্ধের (গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও গত বছর ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা) অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিপক্ষের ওপর কোনো আস্থা ছিল না। শেষ পর্যন্ত তারা ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।’

অনৈক্যের জায়গা পারমাণবিক কর্মসূচি

আলোচনায় যে কটি প্রধান বিষয়ে দুই দেশ মতৈক্যে আসতে পারেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার একটি পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করুক। কিন্তু ইরান মনে করে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের অধিকার। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারে।

ইসলামাবাদ ছাড়ার আগে ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাই বলে গেছেন, ‘আমাদের এমন একটি জোরাল প্রতিশ্রুতি দেখতে হবে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এমনকি দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম—এমন কোনো সরঞ্জাম বা প্রযুক্তিও তারা অর্জনের চেষ্টা করবে না।’

হরমুজ নিয়ে টানাটানি

ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় অন্যতম প্রধান বাধা ছিল হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। ইরান এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রাখতে চায়। কিন্তু এ বিষয়ে ছাড় দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও কঠিন। এই সাগরপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়।

ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ গতকাল বলেছে, দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের জন্য ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, প্রণালিটি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং এখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অবশ্যই ইরানি মুদ্রা ‘রিয়ালে’ টোল পরিশোধ করতে হবে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, মার্কিন বাহিনী শিগগিরই হরমুজে অবরোধ আরোপ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। এ পথ দিয়ে কোনো জাহাজ আর ঢুকতে বা বের হতে পারবে না।

হুমকি দিয়েই যাচ্ছেন ট্রাম্প

ইসলামাবাদে দুই পক্ষ যখন আলোচনার টেবিলে, তখনো একের পর এক হুমকি দিয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আর গতকাল চুক্তি ছাড়া আলোচনা শেষ হওয়ায় যেন আরও খ্যাপেছেন তিনি।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ‘উপযুক্ত সময়ে’ ইরানকে ‘শেষ করে দেবে’ মার্কিন বাহিনী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ ত্যাগ করতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু দেশটিকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দেওয়া হবে না।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত

ইসলামাবাদে দুই পক্ষে মতৈক্যে পৌঁছাতে না পারার একটি কারণ ছিল লেবাননে ইসরায়েলি হামলা। ইরান চায়, লেবাননেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হোক; কিন্তু ইসরায়েল তা মানছে না।

গতকালও দফায় দফায় লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব হামলায় এদিনও অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

দুই মাসেই জ্বালানি সক্ষমতা ফেরাতে চায় ইরান

ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তেল শোধনাগার ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সচল করার লক্ষ্য নিয়েছে ইরান। দেশটির তেল মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, হামলার আগের তুলনায় অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার আশা করছেন তাঁরা। ইতিমধ্যে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, লাওয়ান তেল শোধনাগারের একটি অংশ আগামী ১০ দিনে চালু হতে পারে। বাকি ইউনিটগুলো পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে ফিরবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মঙ্গলবারের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার শোরুম অপসারণের নির্দেশ

কেন ব্যর্থ হলো ইসলামাবাদ সংলাপ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কে কী চায়

পুনর্বহালের এক মাস পর পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা পাবেন কোহিনূর মিয়া

নাগরিকত্ব পেতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান প্রসব, সুযোগ বন্ধ করছেন ট্রাম্প

চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ ইসলামাবাদ আলোচনা, ফিরে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিনিধিদল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত