Ajker Patrika

মার্কিনিদের দানকৃত মরদেহ ইসরায়েলি বাহিনীর চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার, ক্ষুব্ধ স্বজনেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মার্কিনিদের দানকৃত মরদেহ ইসরায়েলি বাহিনীর চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার, ক্ষুব্ধ স্বজনেরা
ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার জন্য দান করা মৃতদেহ ইসরায়েলি সামরিক চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে দাতাদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মৃতদেহগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হতে পারে, সে বিষয়ে দাতা ও তাঁদের পরিবারকে যথেষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সহযোগী প্ল্যাটফর্ম এজেপ্লাসের (AJ+) অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও প্রামাণ্যচিত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএসসি) এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো (ইউসিএসডি) থেকে পাওয়া মৃতদেহ যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত একটি সার্জিক্যাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলি সামরিক চিকিৎসকেরাও অংশ নেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ইউএসসি অন্তত ৮৯টি সদ্য মৃতদেহ সরবরাহ করেছে। এসব মৃতদেহ যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ও ইসরায়েলি সামরিক চিকিৎসা দলের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে। একই সময়ে ইউসিএসডি থেকেও বিপুলসংখ্যক মৃতদেহ এই কর্মসূচির জন্য সরবরাহ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত ইউসিএসডি থেকে ১২৪টি মৃতদেহ ইউএসসিতে স্থানান্তর করা হয়।

এই তথ্য সামনে আসার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দাতাদের পরিবারের সদস্যরা।

নেভাদার বাসিন্দা মিরিয়াম ভলপিনের মা জিনেট ভলপিন ২০২১ সালে ১০১ বছর বয়সে মারা যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক ফ্লাইট নার্স জিনেট মৃত্যুর আগে নিজের দেহ ইউএসসিকে দান করেছিলেন। মিরিয়াম ভলপিন বলেন, ‘আমার ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিল।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তাঁর মায়ের দেহও হয়তো সেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে গাজার যুদ্ধের মতো সংঘাতের জন্য সামরিক চিকিৎসা দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

‘রিঅ্যানিমেট’ করা হতো মৃতদেহ

২০২০ সালে ইউএসসি ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রশিক্ষকদের লেখা একটি চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণাপত্রে চার দিনের একটি ‘কমব্যাট ট্রমা সার্জারি স্কিলস কোর্সের’ বর্ণনা পাওয়া যায়। এই কোর্স ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ফরওয়ার্ড সার্জিক্যাল টিমের জন্য পরিচালিত হতো। প্রশিক্ষণের সময় মৃতদেহগুলোকে ‘পারফিউশন’ পদ্ধতিতে ‘রিঅ্যানিমেট’ বা কার্যত পুনর্জীবিত করা হতো। এতে কৃত্রিম রক্ত দেহের মধ্যে প্রবাহিত করে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মতো রক্তক্ষরণের পরিস্থিতি তৈরি করা হতো।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণে বুকে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ক্ষত, মুখমণ্ডল ও শরীরে বিস্ফোরণের আঘাতসহ বিভিন্ন যুদ্ধজনিত জখমের অনুকরণ তৈরি করা হতো।

এ বিষয়ে ইউএসসি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই প্রশিক্ষণের সময় অভিজ্ঞ ট্রমা সার্জনরা অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ব্যবহার করে জটিল আঘাতের ধরন তৈরি করেন, যাতে অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।’

‘সামরিক কর্মসূচি’ নয় বলে দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের

এজেপ্লাসের কাছে পাঠানো এক ই-মেইলে ইউএসসি দাবি করেছে, এটি কোনো ‘সামরিক কর্মসূচি’ নয়, বরং ‘শিক্ষামূলক’ কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাষ্য, এতে অংশ নেওয়া ইসরায়েলি চিকিৎসাকর্মীরা ছিলেন ‘নন-কমব্যাট্যান্ট’ বা যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নেওয়া ব্যক্তি। একইভাবে ইউসিএসডিও তাদের মৃতদেহ ‘সামরিক প্রশিক্ষণে’ ব্যবহৃত হয় বলে অস্বীকার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির মতে, এ ধরনের বর্ণনা কোর্সটির প্রকৃতি ভুলভাবে উপস্থাপন করে।

তবে এজেপ্লাসের পর্যালোচনা করা ইসরায়েলি সূত্রের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আরও বেশি জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও সার্জন সামনের সারির ইউনিটগুলোর সঙ্গে কাজ করছেন। ফলে এ ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে।

বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেহদানের নথিতে কোথাও উল্লেখ ছিল না যে মৃতদেহগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হতে পারে। ইউএসসি-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মোহামাদ রাদ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘মৃতদেহের সঙ্গে এভাবে আচরণ করাকে আমরা ভয়াবহ মনে করি কি না, সেটা এক বিষয়। কিন্তু আমার কাছে আরও উদ্বেগজনক প্রশ্ন হলো: রোগী কি বিষয়টি জানতেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করা, বিদেশি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা, এসব বিষয়ে তারা কি সম্মতি দিতেন?’

ইউসিএসডিতে নিজের দাদির দেহ দান করা জেনিফার গোমেজও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতেই পারিনি যে আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীগুলো এখানে এসে আমাদের পরিবারের সদস্যদের দেহে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।’ গোমেজ আরও বলেন, ‘বিশেষ করে এমন সামরিক বাহিনী, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং যারা সক্রিয়ভাবে মানুষ হত্যা করছে।’

গোমেজের মতে, দেহদাতাদের সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবহার সম্পর্কে আগে থেকেই জানার সুযোগ থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘আমার দাদির মতো অধিকাংশ মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নেন এই ভেবে যে তারা পৃথিবীর জন্য ভালো কিছু করতে যাচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন,—“তারা এটা ভাবেন না যে, ‘আমি আমার দেহ দান করব, আর কোনোভাবে তা কোনো সামরিক শক্তিকে আরও ক্ষমতাবান করে তুলবে’। ”

ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সম্ভাব্য কিছু দাতাও তাঁদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ওয়েন্ডি স্মিথ জানিয়েছেন, প্রতিবেদন জানার পর তিনি আর নিজের দেহ দান করতে আগ্রহী নন। এপ্রিলে মাসে তিনি বলেন, ‘আমি গণহত্যা ও অনাহারকে সমর্থন করতে চাই না। আমি ক্ষুদ্রতম উপায়েও ইসরায়েলি নীতিকে সমর্থন করতে চাই না।’

এজেপ্লাসের অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সাংবাদিক থমাস মারফি বলেন, ‘যেসব দাতা পরিবারের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তারা এই পরিস্থিতিতে গভীরভাবে বিচলিত। ভালোবাসা ও গর্বের যে স্মৃতি একসময় ছিল, তা এখন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে কলুষিত হয়ে গেছে।’

এদিকে প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের ঠিক আগে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া হেলথ তাদের ওয়েবসাইটে দেহ দানসংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর পাতায় নতুন তথ্য যুক্ত করেছে। সেখানে এখন উল্লেখ করা হয়েছে, দান করা মৃতদেহ অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হতে পারে এবং সামরিক চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা হতে পারে।

তবে ইউএসসি ও ইউসিএসডি তাদের নিজস্ব পৃথক প্রশ্নোত্তর পৃষ্ঠায় এখনো এ ধরনের কোনো পরিবর্তন আনেনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইউএসসির সঙ্গে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির চুক্তি অন্তত ২০২৯ সাল পর্যন্ত নবায়নের জন্য ইতিমধ্যে ‘নোটিশ অব ইনটেন্ট’ জারি করেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত