Ajker Patrika

চলে গেলেন জার্মানদের ইহুদি গণহত্যার দায় নিতে শেখানো দার্শনিক হাবারমাস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চলে গেলেন জার্মানদের ইহুদি গণহত্যার দায় নিতে শেখানো দার্শনিক হাবারমাস
জার্মান দর্শনের দিকপাল এবং যুদ্ধোত্তর জার্মানির বিবেক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ইয়ুগেন হাবারমাস। ছবি: সংগৃহীত

জার্মান দর্শনের দিকপাল এবং যুদ্ধোত্তর জার্মানির বিবেক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ও দার্শনিক ইয়ুগেন হাবারমাস প্রয়াত হয়েছেন। আজ শনিবার জার্মানির স্টার্নবার্গে ৯৬ বছর বয়সে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর সাত দশকের দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা জার্মানির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

১৯২৯ সালে জার্মানির ডুসেলডর্ফে জন্মগ্রহণকারী হাবারমাস শৈশবে ‘কাটা ঠোঁট’ সমস্যার কারণে কথা বলার জড়তায় ভুগতেন। ধারণা করা হয়, এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাই তাঁকে পরবর্তী জীবনে ‘যোগাযোগ’ বা ‘কমিউনিকেশন’ নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি মনে করতেন, একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন মুক্ত আলোচনা ও যুক্তিনির্ভর জনপরিসর। ১৯৫০-এর দশকে ফ্যাসিবাদের কড়া সমালোচনা থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের জাতীয়তাবাদের উত্থান—প্রতিটি সংকটে তাঁর কণ্ঠস্বর জার্মানিকে পথ দেখিয়েছে।

হাবারমাসের অন্যতম বড় অবদান ছিল জার্মানির ‘স্মৃতির সংস্কৃতি’ গড়ে তোলা। ১৯৮৬ সালে যখন কিছু ঐতিহাসিক নাৎসি অপরাধকে সাধারণ যুদ্ধের সহিংসতা হিসেবে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, তখন হাবারমাস রুখে দাঁড়ান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হলোকাস্ট বা ইহুদি নিধনযজ্ঞের অনন্য নৃশংসতাকে স্বীকার করা এবং সেই অপরাধের দায়ভার বহন করা জার্মানির জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। তাঁর এই অনমনীয় অবস্থানের কারণেই জার্মানি আজ বিশ্বজুড়ে তার অতীতের দায় স্বীকারের জন্য প্রশংসিত হয়।

১৯৮৯ সালে দুই জার্মানির পুনঃ একত্রীকরণের সময় হাবারমাস উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, জার্মানিকে উগ্রবাদ থেকে মুক্ত রাখতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সংহতি বাড়ানো অপরিহার্য। জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শুরু করেন। একসময় সেক্যুলার থাকলেও পরে তিনি স্বীকার করেন, প্রাত্যহিক জীবনের অসাধারণ সব ঘটনার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য ধর্ম এখনো মানুষের কাছে অপরিহার্য। যদিও নিজের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি রসিকতা করে বলতেন, ‘ধর্মীয়ভাবে আমি একেবারেই বেতাল।’

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় হাবারমাসের অবস্থান ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি তৎকালীন চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজের ধীরস্থির ও সতর্ক সামরিক সহায়তার নীতিকে সমর্থন করেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। এর ফলে ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূত তাঁকে ‘জার্মান দর্শনের কলঙ্ক’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু হাবারমাসের যুক্তি ছিল ভিন্ন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে পারমাণবিক শক্তিধর কোনো দেশের সঙ্গে এই সংঘাত জার্মানির ভেতর আবার সেই পুরোনো ‘যুদ্ধোন্মাদনা’ ফিরিয়ে আনবে, যা বহু কষ্টে অর্জিত শান্তিকে নস্যাৎ করে দিতে পারে।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে হাবারমাস কিছুটা বিষণ্ন ও চিন্তিত ছিলেন। তাঁর জীবনীকার ফিলিপ ফেলশের মতে, হাবারমাস অনুভব করেছিলেন যে তাঁর সারা জীবনের রাজনৈতিক ও দার্শনিক অর্জন আজ হুমকির মুখে। জার্মানিতে অতি-ডানপন্থী দল ‘এএফডি’র উত্থান এবং নতুন করে বাড়তে থাকা সামরিক মনোভাব তাঁকে ব্যথিত করছিল।

ইয়ুগেন হাবারমাসের মৃত্যু কেবল একজন দার্শনিকের বিদায় নয়, বরং এটি একটি যুগের অবসান। যেই যুগ যুক্তি, সংলাপ এবং শান্তিবাদের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক জার্মানিকে গড়ে তুলেছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জাল সনদে ১২৮ শিক্ষক, ফেরত দিতে হবে টাকা

রাত থেকে গণপরিবহনে তেল নেওয়ার সীমা থাকছে না: সড়কমন্ত্রী

‘সামান্তারা বিক্রি হয়’ মন্তব্য শাহরিয়ারের, ক্ষমা চাইতে বললেন এনসিপি নেতারা

মধ্যপ্রাচ্যের পথে ২৫০০ মেরিন সেনা, স্থল অভিযানের ইঙ্গিত পেন্টাগনের

মাথাবিহীন লাশটি বরিশালের গোপালের, মাথার খোঁজে নদীতে তল্লাশি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত