Ajker Patrika

হরমুজে টোল দিতে রাজি উপসাগরীয় দেশগুলো, তবে ইরানকে নয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হরমুজে টোল দিতে রাজি উপসাগরীয় দেশগুলো, তবে ইরানকে নয়
প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত মিলেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে নীরবে জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য কোনো ধরনের টোল বা ফি দিতে আপত্তি করে না। তবে এই জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

একাধিক মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তার লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানিয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, টোল দেওয়া আর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্যটি সূক্ষ্ম হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও উত্তেজনা ও সংঘর্ষ বাড়তে শুরু করায় বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, কিছু উপসাগরীয় দেশের কাছে টোল কোনো বড় বিষয় নয়। আর্থিকভাবে এটি তাদের অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। তাদের মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। অঞ্চলের আরেক কর্মকর্তা বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না ইরান এমন অবস্থানে পৌঁছাক, যেখানে সে চাইলে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কোন জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবেশ বা প্রস্থান করবে। তাঁর ভাষায়, তারা চায় না ইরান যেন একটি সুইচ টিপে পুরো নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে পারে। সেই তুলনায় টোল বা অর্থপ্রদানের বিষয়টি তাদের কাছে তুচ্ছ।

কর্মকর্তাদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর এই নীরব বার্তাই সম্ভবত ব্যাখ্যা করে কেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার প্রস্তাব সামনে এনেছেন। গত সোমবার ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালির ‘অভিভাবক’ হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ২০ শতাংশ ফি আদায় করা উচিত। তাঁর মতে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতসহ যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অংশীদারদের এই নিরাপত্তা বাবদ অর্থ পরিশোধ করা উচিত।

তবে একই দিনে ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে প্রকাশ্যেই ভিন্ন অবস্থান নেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না। পরে গতকাল মঙ্গলবার দিনের শেষভাবে এসে ট্রাম্প নিজেও এই অবস্থান থেকে সরে আসেন। অন্যদিকে, ইউএইসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ট্রানজিট ফি আরোপের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর আগের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে বলেন, সরাসরি ফি নেওয়ার পরিবর্তে তিনি চান উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে আরও বেশি বিনিয়োগ করুক। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনার ভিত্তিতে তিনি ২০ শতাংশ ‘ইউনাইটেড স্টেটস রিইম্বার্সমেন্ট ফি’ বাতিল করে তার পরিবর্তে বিভিন্ন উপসাগরীয় রাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান পরিবর্তনের পরও মূল ধারণা একই রয়েছে। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো না কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে চায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ট্রাম্প কোথাও বলেননি যে উপসাগরীয় জ্বালানি আমদানিকারক এশীয় দেশগুলো বা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা গ্রিক জাহাজমালিকদেরও যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করা উচিত।

হোয়াইট হাউসে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি উপসাগরীয় সব নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁরা রেকর্ড পরিমাণ অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘এভাবে কোনো ফি থাকবে না। আমি ফি নেওয়ার ধারণাটি পছন্দ করি না। কিন্তু একই সঙ্গে এটা ন্যায্যও নয় যে আমরা পুরো বিশ্বের জন্য, চীনসহ সবার জন্য এই প্রণালি রক্ষা করছি। চীনের জন্য নিরাপত্তা দিতে আমার আপত্তি নেই, কারও জন্যই আপত্তি নেই। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে আমাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত।’

ট্রাম্পের এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে অতিরিক্ত মূল্য (ইকোনমিক প্রিমিয়াম) দিতে প্রস্তুত। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালিতে সার্ভিস ফি চালুর ইরানের প্রচেষ্টা বড় ধাক্কা খেয়েছে ওমানের অবস্থানের কারণে।

ওমান ইরানের সঙ্গে পরামর্শ না করেই নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। একাধিক মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা এমইইকে জানিয়েছেন, ইরানের সার্ভিস ফি পরিকল্পনা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে ওমানের রাজধানী মাসকাটের ওপর ব্যাপক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ওমানের জলসীমায় কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের জাহাজে হামলা চালিয়েছে।

জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (আনক্লস) অনুযায়ী, কোনো দেশ সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমা দাবি করতে পারে। হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল এবং এই প্রণালির তীরবর্তী একমাত্র দুটি রাষ্ট্র হলো ইরান ও ওমান। কিছু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এমইইকে বলেছেন, ওমান ও ইরান যদি যৌথভাবে কাজ করত, তাহলে তারা ‘পাইলটিং ফি’ বা ‘সেবার বিনিময়ে ফি’ আদায়ের জন্য একটি আইনগত ভিত্তি দাঁড় করাতে পারত। কিন্তু ওমান নিজেদের জলসীমা দিয়ে জাহাজগুলোকে অবাধে চলাচলের সুযোগ দেওয়ায় ইরান সেই সম্ভাব্য আইনগত ভিত্তি হারিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত