Ajker Patrika

বেনাপোল স্থলবন্দর: চুরি হচ্ছে জব্দ করা পণ্য

  • কাস্টম হাউসের গুদামে রাখা হয় জব্দ করা পণ্য। সেখান থেকে চুরি হয় নানান কায়দায়।
  • ৬ মাসে ১৩০ জালিয়াতির মামলা। জড়িত কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই।
  • সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের লাইসেন্স বাতিল, কারাগারে কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী।
জাহিদ হাসান, যশোর 
বেনাপোল স্থলবন্দর: চুরি হচ্ছে জব্দ করা পণ্য
ছবি: সংগৃহীত

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা মালিকবিহীন পণ্য জব্দের পর তা রাখা হয়েছিল কাস্টমসের গুদামে। পরে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর কথা বলে সেখান থেকে বের করা হয় সেসব পণ্য। পথে সেগুলো জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

এটি শুধু একটি ঘটনা। বেনাপোল কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ বন্দরে ১৩০টি পণ্য চুরি ও জালিয়াতির মামলা হয়েছে। জালিয়াতি ও চুরির সঙ্গে জড়িত থাকায় কয়েকটি ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। বন্দরের ৪১৮টি সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরদারির পর এমন জালিয়াতির ঘটনায় উদ্বিগ্ন আমদানি-রপ্তানিকারকেরা। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, চুরি বাড়েনি। বরং তারা ঘটনাগুলো প্রকাশ করছে বলে বিষয়টি সামনে আসছে, আলোচনা হচ্ছে।

ত্রাণ তহবিল কেলেঙ্কারি যেভাবে সামনে

বন্দরের সব গুদাম ও ইয়ার্ড বন্দর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে থাকে। তবে বন্দরে কাস্টমসের একটি গুদাম রয়েছে। জব্দ পণ্যগুলো এই গুদামে রাখা হয়। গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর নামে বন্দরের কাস্টমস গুদাম থেকে কাভার্ড ভ্যানে করে পণ্য বের করা হয়। কাভার্ড ভ্যানটি বেনাপোল বাজার মোড়ে আটক করে বিজিবির যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯-বিজিবি)। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় কাভার্ড ভ্যানটি জব্দ করে বিজিবি। এ সময় কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ, গাড়ির চালক এবং চালকের সহকারীকে আটক করা হয়। পরে বিজিবির পক্ষ থেকে বেনাপোল বন্দর থানায় একটি মামলা হয়। এই গাড়িতে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ ছিল।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কাস্টম হাউসের দুজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সিপাহিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ‘বিভাগীয় তদন্ত চলছে। পণ্য চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যেভাবে চুরি হয়

ভারত থেকে ১০০ প্যাকেজ বেকিং পাউডার আমদানির ঘোষণা দিয়ে ১০৮ প্যাকেজ শাড়ি-থ্রি পিস, শিশুর পোশাক ও প্রশাসধনসামগ্রী আমদানি করে সাফা ইমপেক্স ও হুদা ইন্টারন্যাশনাল নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মো. হাসনাইন এই পণ্য ক্লিয়ারিং করেন। পণ্যগুলো ১২ মার্চ থেকে ২ জুন পর্যন্ত দফায় দফায় পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে জব্দ করে কাস্টমস। পণ্যগুলো বন্দরের ৩৭ নম্বর গুদামে রাখা হয়। তবে এসব পণ্য এখন উধাও।

এ ঘটনায় গত ৯ জুন কাস্টমসের পক্ষ থেকে বেনাপোল বন্দর থানায় একটি মামলা করা হয়। ওই মামলায় বন্দর কর্তৃপক্ষের তিনজন ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট ও একজন ট্রাফিক পরিদর্শকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।

এর আগে ৪১ নম্বর গুদাম থেকে গত ১৬ থেকে ২১ মে সময়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ১৪ জুন একটি মামলা হয় কাস্টম হাউসের পক্ষ থেকে। ওই মামলায় বলা হয়েছে, এই পণ্য চুরির সঙ্গে দায়িত্বরত গুদামের সুপারিনটেনডেন্ট, পণ্য ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং এজেন্ট এসএ ট্রডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সোহাগসহ অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জন জড়িত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং এজেন্ট এসএ ট্রডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সোহাগ বলেন, ‘আমার স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত। আমি কিছুই বলতে পারব না। কর্মচারীরা ব্যবসা দেখাশোনা করে। তবে আমি শুধু জানি, আমার লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করেছে কাস্টমস কমিশনার।’

যাঁরা জড়িত চুরিতে

সাম্প্রতিক পণ্য চুরির এমন ঘটনার ৫টি মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চুরি বা পণ্য পাচারের সঙ্গে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ জড়িত। দুটি মামলায় কাস্টমসের পাঁচ কর্মকর্তা কারাগারে আটক আছেন। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় দুজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এবং তিনজন সিপাহিকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে। পাঁচটি মামলার এজাহারে কাস্টমস ও বন্দরের কর্মকর্তা, পণ্য ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টসহ বিভিন্ন পক্ষ জড়িত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বন্দরে এমন চুরির ঘটনার কথা স্বীকার করেন কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বন্দরে পণ্য চুরির বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। বন্দর কর্তৃপক্ষের গুদাম রক্ষকেরাও কয়েকটি চুরির সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। এ বিষয়ে ফৌজদারি কয়েকটি মামলাও হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেনাপোল বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘বন্দরের গুদাম থেকে পণ্য চুরি ঠেকাতে আমরা প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছি। এখনকার চেয়ে আগে চুরির ঘটনা বেশি ঘটত। গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হতো কম। কিন্তু এখন উল্টো। আমরা এখন গণমাধ্যমে নিজেরাই প্রকাশ করে দিচ্ছি। এতে মনে হতে পারে, চুরি বেড়েছে। আসলে চুরি বাড়েনি।’

বন্দর সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ চুরির সঙ্গে বড় সিন্ডিকেটও জড়িত। এর সঙ্গে শুধু কাস্টমস কর্মকর্তারাই না, বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়্যারহাউস সুপার বা গুদাম ইনচার্জ, ট্রাফিক পরিদর্শকসহ কর্মকর্তাদের অনেকে এই চুরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘চুরির সঙ্গে যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট নেই, তা আমি বলব না। রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট—সর্বোপরি কিছু কর্মকর্তাও জড়িত থাকতে পারেন। তবে আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না।’

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

বেনাপোল বন্দরে নজরদারির জন্য রয়েছে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী। এ ছাড়া ৪১৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে এই সিসিটিভি ফুটেজ নিয়েও রয়েছে জটিলতা। বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ‘বন্দরের গুদাম থেকে পণ্য চুরির সঙ্গে ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্টরাও জড়িত রয়েছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেনাপোল বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেওয়ার জন্য আমরা আগ্রহী। কিন্তু বন্দরে ৪১৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এটা অপারেট করে থার্ড পার্টি (তৃতীয় পক্ষ)। এটা টেকনিক্যাল বিষয়। তা ছাড়া নির্দিষ্ট করে সময় জানাতে হয়। এসব কারণে অনেক সময় ফুটেজ পেতে দেরি হয়।’

এমন সমন্বয়হীনতার কারণে চুরি আরও বাড়ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে বেনাপোল বন্দর ব্যবহারকারী সারথী লজিস্টিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা এবং এরপর তা সরিয়ে ফেলার এই প্রতিযোগিতার কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি, ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় অনেক আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এই বন্দর দিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত