Ajker Patrika

ব্রহ্মপুত্রে চীনের মেগা বাঁধে চিন্তিত ভারত—বাংলাদেশও কি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ২২: ৪০
ব্রহ্মপুত্রে চীনের মেগা বাঁধে চিন্তিত ভারত—বাংলাদেশও কি
মধ্য চীনের ইয়াংসিকিয়াং নদীতে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত থ্রি গর্জেস ড্যাম। ব্রহ্মপুত্রে চীনের মেগা বাঁধ এরচেয়েও বড় হবে। ছবি: এএফপি

ভারতের আপত্তি ও দীর্ঘদিনের উদ্বেগ উপেক্ষা করে তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো (যা ভারতে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত) নদীর নিম্ন অববাহিকায় বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে চীন। ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিশাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক গতি পেয়েছে বলে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়েছে।

সীমান্তবর্তী এই মেগা প্রকল্পের কারণে ভাটির দেশ হিসেবে ভারতের অর্থনীতি, পরিবেশ ও কৌশলগত নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তিব্বতে উৎপত্তি লাভ করা ইয়ারলুং সাংপো নদীটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশ হয়ে দেশে প্রবেশ করে ‘সিয়াং’ নাম ধারণ করেছে। এরপর এটি আসামের ওপর দিয়ে ‘ব্রহ্মপুত্র’ নদ হিসেবে প্রবাহিত হয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। ফলে এই নদীর উজানে যেকোনো ধরনের বড় হস্তক্ষেপ ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা এই মেগা বাঁধের কারণে মূলত দুটি বড় ধরনের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন।

এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে, পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ব্রহ্মপুত্রের উজানে এত বড় বাঁধ দেওয়ার ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হবে। এর ফলে ভাটি অঞ্চলে পলি মাটির প্রবাহ কমে যাওয়া, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়া ও নদী অববাহিকার স্বাভাবিক বন্যা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ওলট-পালট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক চাপ। বাঁধের কারণে নদীর ওপরের অংশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে বেইজিংয়ের হাতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো দ্বিপক্ষীয় বিরোধ বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চীন যদি এই বাঁধের পানি আটকে দেয় কিংবা হঠাৎ করে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেয়, তবে তা ভারতের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। এটি বেইজিংকে নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে একটি অতিরিক্ত কৌশলগত সুবিধা দেবে।

চীনের দাবি বনাম ভারতের অবস্থান

চীনের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হচ্ছে যে, এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একমাত্র উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং এর ফলে ভারত বা অন্য কোনো ভাটির দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু নয়াদিল্লি বেইজিংয়ের এই আশ্বাসে পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছে না।

ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং দেশের সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, সরকার এই মেগা বাঁধের বিষয়ে কয়েক দশক ধরে নজর রাখছে। তিনি জানান, ১৯৮৬ সালে এই প্রকল্পের কথা প্রথম জনসম্মুখে আসে এবং তখন থেকেই চীন এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, ২০০৬ সালে গঠিত এক্সপার্ট লেভেল মেকানিজমসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারত বারবার চীনের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে এবং উজানের কোনো কর্মকাণ্ডে যাতে ভাটির দেশগুলোর ক্ষতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে বেইজিংকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি দুই দেশের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক স্তরেও তোলা হয়েছে। গত বছর (জুলাই ২০২৫) সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যখন চীন সফর করেন, তখনো বেইজিংয়ের সামনে এই মেগা বাঁধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হয়েছিল।

কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ভারত এখন নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের ভাটি অঞ্চলে চীনের যেকোনো ধরনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভাব ও সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে নয়াদিল্লি।

তবে উজানে ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের এই মেগা বাঁধ নির্মাণের ফলে শুধু ভারত নয়, ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপরও এর নেতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এনডিটিভির মূল প্রতিবেদনে শুধু ভারতের উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ ভারতের আসাম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় ক্ষতিকর প্রভাবগুলো সরাসরি বাংলাদেশের ওপরও বর্তাবে।

ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পানিসংকট নিরসনকারী উৎস। চীন যদি এই মেগা বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখে, তবে বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে নদীর পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এর ফলে দেশের একটি বিশাল অঞ্চলে পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে, যা কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা ব্যাহত করবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নামিয়ে দিয়ে মরুকরণপ্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

বাংলাদেশের যমুনা বা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি ও ফসল উৎপাদন এই নদের পানির ওপর নির্ভরশীল। পানিপ্রবাহ কমে গেলে সেচসংকট তৈরি হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্যশস্য (বিশেষ করে বোরো ও আমন ধান) উৎপাদনের ওপর। এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকিতে ফেলবে।

নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হলে তা পরিবেশ ও নদীর বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে। নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হবে। এ ছাড়া নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে চারপাশের বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

উজানে বাঁধ দেওয়ার বড় একটি অসুবিধা হলো—পলি জমে যাওয়া। চীন যদি বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির চাপ সামলাতে না পেরে হঠাৎ বাঁধের গেট খুলে দেয়, তবে বাংলাদেশ অংশে আকস্মিক ও ভয়াবহ কৃত্রিম বন্যা দেখা দেবে। আবার স্বাভাবিক পলিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে বর্ষায় নদীর পাড় ভাঙনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

উজানের দেশের হাতে নদীর চাবিকাঠি থাকা মানে ভাটির দেশের ওপর সব সময় একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ থাকা। নদী নিয়ে কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় বিরোধ তৈরি হলে চীন পানিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ওয়াটার উইপন হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত