Ajker Patrika

জিডিপি ছাড়িয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ, ১ ডলার আয়ে খরচ ১.৩৩

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ১১: ১৪
জিডিপি ছাড়িয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ, ১ ডলার আয়ে খরচ ১.৩৩
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এখন দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশের বেশি ছাড়িয়ে গেছে। একসময় যেটা কল্পনাতীত ছিল, সেই সীমা অতিক্রম করে দেশটি এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের রেকর্ড ভাঙার পথে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশটির জনগণের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার। একই সময়ে আগের এক বছরে জিডিপি ছিল ৩১ দশমিক ২১৬ ট্রিলিয়ন ডলার। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এতে ঋণ-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১০০ দশমিক ২ শতাংশে।

এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া গত অর্থবছরে এই হার ছিল ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ভবিষ্যতেও এই অনুপাত বাড়তে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, ফেডারেল সরকার প্রায় জিডিপির ৬ শতাংশ সমপরিমাণ বিশাল বার্ষিক বাজেট ঘাটতি চালিয়ে যাচ্ছে, যা ঋণ বাড়াচ্ছে।

সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করছে, তার প্রতি ১ ডলার আয় করতে ব্যয় করছে ১ দশমিক ৩৩ ডলার। চলতি বছরে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের তুলনায় খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের করছাড় কার্যকর হয়েছে আগে, ব্যয় কমানোর পদক্ষেপগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। আর চূড়ান্ত হিসাব নির্ভর করবে ইরান যুদ্ধের ব্যয়, শুল্ক ফেরত এবং অর্থনীতির শক্তিমত্তার ওপর।

এই অনুপাত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিন জমে থাকা আর্থিক চাপের শক্তিশালী প্রতীক। উভয় দলের আইনপ্রণেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য করছাড় ও ব্যয় বৃদ্ধিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। মার্কিন কংগ্রেসের কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্ক গোল্ডওয়েইন বলেন, ‘আমরা অজানা এক পথে এগোচ্ছি। ১০০ শতাংশ আর ৯৯ শতাংশের মধ্যে কোনো জাদু নেই, কিন্তু এটা ভয়ংকর এক জায়গা।’

ঋণ-জিডিপি অনুপাত অর্থনীতিবিদদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক, যা দেখায় দেশের ঋণ অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ তৈরি করছে। অনুপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ এমন সম্পদ ব্যবহার করে ফেলে, যা অন্য খাতে আরও উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার করা যেত। ঋণ বাড়লে সুদহারেও সরকারের সংবেদনশীলতা বাড়ে। বর্তমানে ফেডারেল ব্যয়ের প্রতি সাত ডলারের এক ডলারই সুদ পরিশোধে যাচ্ছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সুদের হার মাত্র দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বাড়লে আগামী ১০ বছরে অতিরিক্ত ৩৭৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।

কোনো পরিবর্তন না হলে যুক্তরাষ্ট্র এমন ঋণ অনুপাতের দিকে এগোচ্ছে, যা ইতিমধ্যে ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস ও জাপানে দেখা গেছে। এসব দেশ বিভিন্ন মাত্রায় অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ঋণ নেওয়ার কিছু অতিরিক্ত সুযোগ আছে। কারণ, তাদের মুদ্রা বিশ্ব রিজার্ভ কারেন্সি এবং ট্রেজারি ঋণ বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে এ সুবিধা সীমাহীন নয়। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ ঋণ সুদের হার বাড়াবে, যার প্রভাব পড়বে গৃহঋণ, গাড়িঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ওপর। একই সঙ্গে এটি পুঁজি শোষণ করে বেসরকারি বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতিবিদ জেমস পোটারবা বলেন, ‘যখন বন্ডে বিনিয়োগ করে বেশি আয় করা যায়, তখন বাস্তব অর্থনীতির প্রকল্পগুলোতেও বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফা চাইবে।’

কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, উচ্চ ঋণ মুদ্রাস্ফীতিও বাড়াতে পারে। কারণ, এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ পড়ে সুদের হার কম রাখতে এবং চরম অবস্থায় ঋণ শোধে টাকা ছাপাতে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় অল্প সময়ের জন্য ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তখন জিডিপি কমে যায় এবং সরকার বড় আকারে ঋণ নিয়ে জনগণকে সহায়তা দেয়। পরে প্রণোদনা শেষ হওয়া, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে নামমাত্র জিডিপি বাড়ায় অনুপাত কমে আসে।

প্রসঙ্গত, ১৯৪৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থবছর শেষ করেনি যেখানে ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশের বেশি ছিল। এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে যাচ্ছে। ২০২০-২১ সালের মতো এটি সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত কারণ থেকে আসা ঘাটতি, আর এখন সুদের হারও বেশি। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া অর্থবছরে অনুপাত ১০০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।

এই হিসাবগুলোতে জনসাধারণের কাছে থাকা ফেডারেল ঋণ ধরা হয়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। এতে সরকারের নিজের কাছে থাকা ঋণ অন্তর্ভুক্ত নয়। জিডিপি হিসাব করা হয়েছে আগের চার প্রান্তিকের নামমাত্র উৎপাদনের ভিত্তিতে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতির সমন্বয় করা হয়নি।

ঋণ-জিডিপি অনুপাতের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ১৯৪৬ সালে ১০৬ দশমিক ১ শতাংশ। পরবর্তী এক দশকে যুদ্ধ-পরবর্তী দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামরিক ব্যয় দ্রুত কমানোর কারণে এই হার কমে আসে এবং ১৯৫৭ সালে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। ২০০৮ সালেও এই অনুপাত ৪০ শতাংশের নিচে ছিল।

এরপর ২০০৭-০৯ সালের আর্থিক সংকট এবং মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক ঋণ নেয়। কংগ্রেস ২০১৩, ২০১৭ ও ২০২৫ সালে কর কমিয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও ভেটেরান সুবিধা বাড়িয়েছে, কিন্তু বড় ব্যয় কর্মসূচিতে তেমন পরিবর্তন আনেনি। এমনকি ঘাটতি কমানোর প্রবল সমর্থকেরাও এখন আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মতো দ্রুত ঋণ কমানোর কথা বলেন না। তাদের লক্ষ্য এখন অন্তত অনুপাতটি আর না বাড়া। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বয়স্ক হচ্ছে, ফলে মেডিকেয়ার ও সোশ্যাল সিকিউরিটির ব্যয় বাড়ছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম গেইল বলেন, ‘২০ বছর পর যদি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০০ শতাংশ থাকে, আমি খুবই সন্তুষ্ট হব।’

কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালে এই অনুপাত ১২০ শতাংশে এবং ২০৫৬ সালে ১৭৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এই পূর্বাভাসে ধরা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করছাড়, যেমন—টিপস ও অতিরিক্ত কাজের আয়ের ওপর ছাড়, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শেষ হবে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে যে শুল্ক হার ছিল, সেটিই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৮৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এই অনুমাননির্ভর করছে বড় অঙ্কের শুল্ক আয়, ব্যয় কমানো এবং কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।

এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি না হলে, অনুপাত ১০০ শতাংশে ধরে রাখাও কঠিন হবে। আগামী এক দশকে মোট বাজেট ঘাটতি ২৪ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে। এই অনুপাত স্থিতিশীল রাখতে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ব্যয় কমানো বা কর বাড়ানোর প্রয়োজন হবে, যা রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হতে পারে।

১৯৮০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত ঋণ নিয়ে উদ্বেগ ছিল বড় রাজনৈতিক ইস্যু। তখন কর বাড়ানো ও ব্যয় কমানোর মাধ্যমে এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বাজেটে উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন ঋণ ও ঘাটতি বাড়লেও উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া তেমন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প জাতীয় ঋণ শূন্যে নামানোর কথা বলেছিলেন, কিন্তু তার প্রস্তাবিত নীতিগুলো, যেমন কর কমানো এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি ও মেডিকেয়ার সুবিধা না কমানোর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে উল্টো প্রভাব ফেলেছে। তিনি প্রায়ই বলেন, শুল্ক আয় দিয়ে ঋণ কমানো সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে তা পর্যাপ্ত রাজস্ব আনতে পারেনি।

গেইল বলেন, ‘যা মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দেয়—তা হলো রাজনীতির অকার্যকারিতা। যদি শুধু অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দেখতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে রাজনৈতিক নেতারা একসঙ্গে বসে এই সমস্যা সমাধান করতে পারবেন, তাহলে সবাই অনেকটা আশ্বস্ত হতো।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঘরে ঢুকে বৃদ্ধাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ, ৮ দিন পরে মামলা

এপস্টেইন দ্বীপের রহস্যময় ‘মসজিদ’: পবিত্র কাবার গিলাফ ও কিসওয়া চুরির তথ্য ফাঁস

নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কায় সবকিছুতে আপস করেছি: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বোনের ক্যারিয়ার বাঁচাতে তদবির করেছেন প্রিয়াঙ্কা, তাঁর পরামর্শেই বিজেপিতে রাঘব!

আজকের রাশিফল: প্রাক্তনের ফোনে সংসারে সুনামি নামবে, আয়নায় নিজেকে ভেংচি কাটলে ইগো কমবে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত