Ajker Patrika

জাপানের সঙ্গে বিরোধ: মাঝপথে স্থবির প্রকল্প, ১১ বছর ঝুলে আছে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৫: ৫৫
জাপানের সঙ্গে বিরোধ: মাঝপথে স্থবির প্রকল্প, ১১ বছর ঝুলে আছে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন
ভারতের বুলেট ট্রেন প্রকল্প ঘুরে দেখছেন মোদি। ছবি: সংগৃহীত

ভারত যখন প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সহায়তার জন্য জাপানের দিকে তাকানো খুবই স্বাভাবিক ছিল। কারণ জাপানই উচ্চগতির রেলব্যবস্থার উদ্ভাবক এবং কম সুদে অর্থায়ন করতে আগ্রহী একটি দেশ।

কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পরও এই রেলপথে কোনো যাত্রী চলাচল শুরু হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয়বৃদ্ধি এবং প্রকল্পের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও সেবা কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এতে এমন দুই দেশের মধ্যে স্বার্থের মৌলিক টানাপোড়েনও সামনে এসেছে, যাদের অবকাঠামো উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এতদিন যেন ভিন্ন ভিন্ন পথে এগোচ্ছিল।

মহারাষ্ট্রের মুম্বাই থেকে গুজরাটের আহমেদাবাদ পর্যন্ত ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ ভারতের রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের রেলব্যবস্থা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম।

উচ্চগতি, নির্ভরযোগ্যতা ও দক্ষতার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত জাপানের বুলেট ট্রেনের প্রযুক্তি নেওয়ার জন্য নয়াদিল্লি জাপানের সঙ্গে চুক্তি করে। ২০১৫ সালে দুই দেশ ৯৮০ বিলিয়ন রুপির (তখনকার হিসাবে ১৫ বিলিয়ন ডলার) একটি চুক্তিতে সম্মত হয়। এই প্রকল্পের অর্থায়নে জাপান ৫০ বছরের জন্য মাত্র দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

তবে প্রকল্পটির চালু হওয়ার সময়সূচি প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ২০২৩ সালের তুলনায় অনেক পিছিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় বেড়ে অন্তত ১ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপিতে (১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, অগ্রগতি না হওয়ার জন্য ১০০ শতাংশ দায় ভারতীয় পক্ষের। তিনি আরও বলেন, তারা কখনোই নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না।

জাপানি কর্মকর্তারা নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগও করেছেন। তাদের অভিযোগ, ভারতের পক্ষ থেকে রেলপথের সিগন্যালিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি জার্মান শিল্পগোষ্ঠী সিমেন্সকে দেওয়া হয়েছে। সিমেন্স আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলেছেন, এই সিদ্ধান্তে জাপানের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো—যার নেতৃত্বে রয়েছে জেআর ইস্ট—হতাশ হয়েছে।

জাপানের পক্ষের যুক্তি হলো, একটি সমন্বিত বা একীভূত রেলব্যবস্থা জাপানের বুলেট ট্রেনের নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখে। অন্যদিকে জাপানি রেললাইন, ইউরোপীয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ভারতীয় ট্রেন মিলিয়ে যে মিশ্র বা হাইব্রিড ব্যবস্থা তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে, তা আগে কোথাও পরীক্ষিত হয়নি। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত জাপানি এক সূত্র বলেন, এটা এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে। তিনি জানান, আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। জেআর ইস্ট প্রকল্পের নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বেগ কতটা গভীর, তার আরেকটি ইঙ্গিত হলো, টোকিও জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পটি তদারকির জন্য নতুন একটি পদ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা নিজস্ব উচ্চগতির ট্রেন তৈরি করবে, যা জাপানের কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের সমপর্যায়ের সক্ষমতা অর্জন করবে।

ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুই পক্ষই পুরোপুরি একই অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, বিস্তারিত আলোচনা ও উভয় পক্ষের সম্মতির পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মোদির আধুনিকায়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ

নরেন্দ্র মোদির জন্য ভারতের রেলব্যবস্থার আধুনিকায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের বর্তমান রেলব্যবস্থার বড় একটি অংশ ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল। এই রেলব্যবস্থার আধুনিকায়ন মোদির নিজেকে আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একই সঙ্গে এই প্রকল্প মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ পরিকল্পনাতেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো দেশে প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদন বাড়ানো। ইতিমধ্যে ভারত তার ব্রড-গেজ রেলপথের ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুতায়িত করেছে। ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় এই হার অনেক বেশি।

আহমেদাবাদ-মুম্বাই রুটে এরই মধ্যে ভারতীয় তৈরি ‘সেমি-হাই-স্পিড’ বন্দে ভারত ট্রেন চলাচল করছে। এই রুটের পাশাপাশি ভারতের রেল মন্ত্রণালয় আরও সাতটি উচ্চগতির রেল করিডর নির্মাণের জন্য নির্ধারণ করেছে। এসব করিডরের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার। এসব প্রকল্পে মোট ১৬ ট্রিলিয়ন রুপি (১৬৭ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ আকর্ষণের আশা করছে ভারত। দেশটি জানিয়েছে, আগামী গ্রীষ্মে এই উচ্চগতির রেলপথ চালু হবে। তবে প্রথম পর্যায়ে মাত্র ১০০ কিলোমিটার অংশে ট্রেন চলবে এবং সেখানে অপেক্ষাকৃত ধীরগতির ভারতীয় তৈরি ট্রেন ব্যবহার করা হবে।

জাপানি কূটনীতিকেরা অবশ্য বলেছেন, প্রথম ধাপের দৈর্ঘ্য হবে মাত্র ৫০ কিলোমিটার। একই সঙ্গে তারা এই সময়সূচি বাস্তবায়ন নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। উচ্চগতির রেল প্রকল্পে বিলম্ব অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। যুক্তরাজ্যের এইচএস ২ প্রকল্প এবং জাপানের হোক্কাইডো বুলেট ট্রেন সম্প্রসারণ প্রকল্প দুটিই নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে বেশি খরচ হয়েছে।

প্রযুক্তি ও খরচ নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান

আহমেদাবাদ-মুম্বাই প্রকল্পের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতীয় আলোচকেরা ভবিষ্যতে আরও বেশি স্বাধীনতা রাখার সুযোগ তৈরি, প্রযুক্তিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বা দেশীয়করণ এবং খরচ কমানোর বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।

অন্যদিকে জাপান চেয়েছে, অবকাঠামো রপ্তানির ক্ষেত্রে পুরো ব্যবস্থাটিকে একটি সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে ধরে রাখতে। একই সঙ্গে জাপানি পক্ষের কথাবার্তা ও আচরণে যে ধরনের জাপানি শ্রেষ্ঠত্বের মানসিকতা দেখা গেছে বলে ভারতীয় পক্ষ মনে করেছে, তাতেও তারা বিরক্ত হয়েছে। জাপানে কূটনীতিকেরা স্বীকার করেছেন, দেশটির করপোরেট খাতে বাইরের বিশ্বের প্রতি এক ধরনের অন্তর্মুখী মানসিকতা এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন কর্মী তৈরি ও তাদের এগিয়ে নেওয়ার ব্যর্থতা দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তিরা দুই দেশের সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কথাও বলেছেন। এর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব মেনে নেওয়ার মানসিকতার পার্থক্যও রয়েছে। আলোচনায় যুক্ত জাপানের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, ‘জাপানিরা বাস্তবসম্মত পর্যায়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং আমরা সেগুলো খুব ভালোভাবে বাস্তবায়ন করি। ভারতীয়রা লক্ষ্য অনেক উঁচুতে নির্ধারণ করে এবং পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে না, তবে বেশ ভালোভাবেই করে।’

ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, প্রকল্পের প্রথম অংশের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু জাপানের পরবর্তী প্রজন্মের ই১০ ট্রেন সরবরাহের সম্ভাব্য সময় ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে। ফলে দুই সময়ের মধ্যে ‘উল্লেখযোগ্য ব্যবধান’ থাকবে। এই ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩২০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে।

চীনের প্রেক্ষাপটে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ

তবে দুই দেশের এই বিরোধ থেকে যে ক্ষতি হতে পারে, তার চেয়ে ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী চীনের মোকাবিলায় ভারত ও জাপানের ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত গুরুত্ব বেশি হতে পারে। জুলাই মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, দুই দেশের উচিত তাদের সম্পর্ককে ‘ভাই ও বোনের মতো’ করে আরও উন্নত করা।

দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আগামী বছর সীমিত পরিসরে উচ্চগতির রেল চলাচল শুরু করার ভারতের লক্ষ্যকে জাপান ‘পুরোপুরি বুঝতে পারছে।’ ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, ‘উচ্চগতির রেল প্রকল্পের গতির চেয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতি বেশি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত