Ajker Patrika

‘ব্যয়বহুল নরকযাত্রা’ শেষে ইরাক ছেড়েছে শেষ মার্কিন সেনাটিও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
‘ব্যয়বহুল নরকযাত্রা’ শেষে ইরাক ছেড়েছে শেষ মার্কিন সেনাটিও
ইরাকের আনবার প্রদেশে আল আসাদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা চিনুক হেলিকপ্টারে উঠছেন। ছবি: মার্কিন বাহিনী

ইরাক থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ত (আইএসআইএল বা আইএস) বিরোধী মিশনে থাকা সর্বশেষ মার্কিন সেনাদেরও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ১২ বছরের সামরিক মিশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের ইরবিল বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক জোটের বাকি সেনারা নিজেদের সরঞ্জামসহ চলে গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, এই প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে আইএসআইএলকে ইরাকে একটি সংগঠিত সামরিক শক্তি হিসেবে পরাজিত করার ১২ বছরের অভিযান শেষ হলো। এখন ইরাকের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব ইরাকি বাহিনীর হাতে থাকবে।

তিনি বলেন, আইএসআইএলের অবশিষ্ট সদস্যদের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেও মোকাবিলা করতে হবে ইরাককে। এসব গোষ্ঠী ইরাকের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।

মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার হলেও ইরাককে পুরোপুরি ছেড়ে যাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরাকি বাহিনীকে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া অব্যাহত থাকবে। আইএসবিরোধী অভিযানের দায়িত্বে থাকা মার্কিন টাস্কফোর্সকে ইরাক থেকে জর্ডানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সিরিয়ায় এখনও কয়েকশ মার্কিন সেনা রয়েছে।

২০০৩ সালে শুরু, ১২ বছর ধরে নতুন মিশন

ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির শুরু ২০০৩ সালে। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ওই বছর ইরাকে হামলা চালায়। তখন অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম।’ ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছায়। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দফায় সেনা প্রত্যাহার করে।

কিন্তু ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসআইএলের দ্রুত উত্থানের পর আবার মার্কিন সেনা পাঠানো হয়। এবার মিশনের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ।’ ২০১৭ সালে আইএসআইএল তাদের নিয়ন্ত্রিত অধিকাংশ ভূখণ্ড হারানোর পর ইরাকে থাকা বিদেশি সেনাদের ভূমিকা ধীরে ধীরে সামরিক অভিযান থেকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার দিকে চলে যায়। গত বছরের শেষ দিকে ইরাকে থাকা কয়েকশ বিদেশি সেনাকে ইরবিলে একত্র করা হয়েছিল। প্রত্যাহারের আগে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জোটের প্রায় ১ হাজার ৫০০ সেনা ছিল।

‘আমেরিকার ঘরে ফেরার সময় হয়েছে’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ইরাকে থাকা বা সেখান থেকে চলে যাওয়ার মধ্যে তার সামনে একটি সিদ্ধান্ত ছিল এবং তিনি মনে করেছেন, ‘এখনই আমেরিকার ঘরে ফেরার সময়।’

ট্রাম্প এই প্রত্যাহারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের বিজয় এবং আইএস–এর বিরুদ্ধে একটি ‘নির্ণায়ক বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক সম্পৃক্ততাকে ট্রাম্প ‘অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক নরকযাত্রা’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে। দেশটি গত কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও আশপাশের অঞ্চলে একের পর এক সংঘাত চলছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে ইরাক একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পরিণত হবে বলে তিনি আশা করছেন।

ইরাকে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য আঞ্চলিক ও অন্যান্য দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পও আল-জাইদির প্রশংসা করে তাঁকে ‘চমৎকার’ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আল-জাইদিকে তিনি শুরু থেকেই সমর্থন করে আসছেন। এরই মধ্যে ইরাক সরকার দেশটির শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ইরানের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি গোষ্ঠীও রয়েছে। সরকার আগামী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে এসব গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্য নিয়েছে।

তবে বিষয়টি সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকার করলে ইরাকের ভেতরেই বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এসব গোষ্ঠী যদি মার্কিন স্বার্থে হামলা বাড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও ইরাকের ওপর নতুন করে চাপ দিতে পারে।

কুর্দিদের উদ্বেগ

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল। কুর্দি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে অঞ্চলটি ইরানের সম্ভাব্য হামলা এবং আইএসআইএলের পুনরুত্থানের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে ইরাকি সরকার বলছে, দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর নিজেদের সক্ষমতা যথেষ্ট রয়েছে। মার্কিন সেনা ছাড়াও তারা আইএসআইএলসহ অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করতে পারবে। আইএসআইএল এখন আর ইরাক বা সিরিয়ায় কোনো বড় ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে না। তবে দুই দেশেই তাদের ছোট ছোট সশস্ত্র সেল এখনও সক্রিয় রয়েছে। ইরাকি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সুযোগ নিয়ে আইএসআইএল আবারও হামলা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত