Ajker Patrika

চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন মোজতবা—দাবি ট্রাম্পের, ইরান বলছে ‘না’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ১০: ৩২
চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন মোজতবা—দাবি ট্রাম্পের, ইরান বলছে ‘না’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি চলতি সপ্তাহান্তেই সই হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, চুক্তি কার্যকর হলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি আবারও জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তবে ইরান জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে এটিই হবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। গত কয়েক মাসে সংঘাতের কারণে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বৈশ্বিক জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দেশটির গণমাধ্যমকে বলেছেন, আলোচনাধীন চুক্তির খসড়ার বড় অংশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে ইরান তার মৌলিক অবস্থান বা ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা থেকে সরে আসবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় রয়েছে।’

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা মাত্রই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের একটি অসাধারণ নিষ্পত্তি করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তিতে স্বাক্ষর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রণালিটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে। সেটা খুব শিগগিরই হতে পারে, খুবই শিগগির। হয়তো ইউরোপে এই সপ্তাহান্তেই।’

ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি চুক্তিটিতে সম্মতি দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার জানা মতে উত্তর হলো—হ্যাঁ।’

ট্রাম্পের এই ঘোষণার আগে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত করা হয়। তিনি আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়টি উল্লেখ করে হামলা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। এ ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যায়।

গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করে আসছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহেও দুই পক্ষ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে, যা এপ্রিল মাসে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি খুব শক্তিশালী সমঝোতা স্মারক, যদিও কিছুটা ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে।’

তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো শান্তি চুক্তির মূল শর্ত হবে ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।

চুক্তির বিনিময়ে ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি চেয়েছে। পরে টেলিফোনে আয়োজিত এক নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। অর্থাৎ তারা তা তৈরি করবে না, আবার কিনবেও না।’

পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে চলমান যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিও চাপে পড়েছে। এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।

একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর ট্রাম্প এ সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির আশপাশে টানা দুই দিন নতুন হামলার নির্দেশ দেন। একই সময়ে ইরানও অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার পর তার ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক ১১ বছর বয়সী মেয়ে সামান্য আহত হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাম্প আরও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সেদিন রাতেই ইরানের ওপর ‘খুব কঠোর’ হামলা চালাবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের তেল অবকাঠামোর প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানান।

ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে গেলে তারা ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে পারবে, যা তেহরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ ফেলবে। শুক্রবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির বাহিনী সমন্বয় ছাড়া একটি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে বাধা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে হয়ে থাকে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।

ট্রাম্পের ওপর বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

এই যুদ্ধ এখন হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, জ্বালানির উচ্চমূল্যে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। রিপাবলিকান পার্টির কিছু নেতা প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন, যুদ্ধের অজনপ্রিয়তা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তবে ট্রাম্পকে একই সঙ্গে নিজের দলের ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থানের সমর্থকদেরও সন্তুষ্ট রাখতে হচ্ছে। তারা অতীতে একটি সমঝোতা উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়েছিল এবং এখনো দাবি করছে, যেকোনো চুক্তির মাধ্যমে তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য প্রভাবশালী দেশের প্রতিক্রিয়াও চুক্তির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ এই চুক্তিকে অনুমোদন দিয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ফোনালাপের পর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয় ইসরায়েল।

বিবৃতিতে বলা হয়, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ভেঙে ফেলা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি চুক্তি নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেছেন নেতানিয়াহু।

অন্যদিকে তেহরান দীর্ঘদিন ধরে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। সেখানে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের মধ্যে সমান্তরাল আরেকটি যুদ্ধ চলমান রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত