Ajker Patrika

নেপালে বন্যার এক মাস: নিহত ১৪৫৩, এখনো নিখোঁজ প্রায় ৬ হাজার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩: ৫৪
নেপালে বন্যার এক মাস: নিহত ১৪৫৩, এখনো নিখোঁজ প্রায় ৬ হাজার
গত ২৬ আগস্টের আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনে সবিতা রিজাল ও তাঁর স্বামী বদ্রী প্রসাদ রিজাল। ছবিটি ২২ সেপ্টেম্বর নেপালের নুওয়াকোট জেলার ত্রিশুলি থেকে তোলা। ছবি: এএফপি

সৌদি আরবে টানা পাঁচ বছর কাটিয়ে জমানো সঞ্চয় নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন নেপালের নারায়ণ প্রসন্ন। কিন্তু ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে তাঁর মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতবাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরিবারকে আবার দাঁড় করাতে তিনি পুনরায় বিদেশে পাড়ি জমান এবং কষ্টার্জিত অর্থে নতুন বাড়ি বানিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস শুরু করেন। তবে গত মাসের ভয়াবহ বন্যা ও ধস প্রসন্নের সেই স্বপ্ন আবার ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবার নিয়ে স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রসন্ন। এখন ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবারও বিদেশে পাড়ি জমানোর কথা ভাবছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রসন্ন বলেন, ‘এই বন্যা আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

নেপালে প্রলয়ংকরী বন্যার এক মাস পার হলেও হাজার হাজার পরিবার আজও বাস্তুচ্যুত। অন্যদিকে নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষের সন্ধানে এখনো উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকেই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ছয়টি সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো। বিষয়টি দেশটির সরকারকেও দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল পুনর্বাসন সংকটের মুখে ফেলেছে।

গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে নিজের প্রথম ভাষণে হিমালয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জলবায়ুঝুঁকির কথা তুলে ধরেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। এই প্রলয়ংকরী বন্যাকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘বিপর্যয়টি কেবল একটি আঞ্চলিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। আমি আজ আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই—আমরা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনতে পেরেছি?’

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নেপালের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। বালেন্দ্র শাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমান্ত চেনে না। হিমবাহ গলে যাওয়া কিংবা বন্যা পাসপোর্ট-ভিসা দেখে কোনো দেশে প্রবেশ করে না।

ডিএনএ পরীক্ষার বিলম্বের কারণে মিলছে না মরদেহ

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এজেন্সির তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্তত ৫ হাজার ৬৪৪ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে মাত্র ১১২টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ১ হাজার ৩৩৩টি মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন বা সৎকার করে রাখা হয়েছে। প্রতিবেশী চীন সীমান্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।

কাঠমান্ডুর নেপাল পুলিশ হাসপাতালে বিশেষ তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা এসে ডিএনএ নমুনা জমা দিচ্ছেন। ল্যাবরেটরি কর্মকর্তারা গোপনীয়তার স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য না জানালেও জানিয়েছেন, ভারতের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মরদেহের পরিচয় শনাক্তের এই জটিল প্রক্রিয়ায় নেপালকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছেন।

জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক রবি কুমার থাপা মগার এই বন্যায় তাঁর স্ত্রী, ভাই, ভাবি ও মাকে হারিয়েছেন। তিনি জানান, পুলিশের ছবি দেখে তিনি স্ত্রীকে শনাক্ত করেছিলেন, কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার আইনি প্রক্রিয়ার কারণে মরদেহ স্বজনদের হাতে দেওয়া হয়নি। পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইলিং সম্পন্ন হতে অন্তত এক মাস সময় লাগবে বলে জানানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কায়িক বা প্রতীকী কুশপুত্তলিকা দাহ করে পরিবারের পক্ষ থেকে শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হয়েছে তাঁদের।

সন্তান হারানো পরিবারের শোক

উদ্ধার হওয়া বহু পরিবারের শোক এখনো কাঁচা। নিজের ছোট্ট ছেলেকে বন্যায় হারানো ৩২ বছর বয়সী পাসং মায়া তামাং জানান, তিনি এখনো রাতে স্বপ্নে ছেলের আকুতি শোনেন।

নুওয়াকোট শহরের একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তামাং বলেন, ‘আমার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, কিন্তু তাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগটুকুও আমি পাইনি। স্বপ্নে আমি স্পষ্ট শুনি—সে আমাকে প্রশ্ন করছে, কেন আমি তাকে এভাবে একা ফেলে রেখে গেলাম?’

ঘটনার দিন সকালে তাঁর ছেলে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে স্কুলে গিয়েছিল। যখন তিনি খবর পান, ততক্ষণে সম্পূর্ণ স্কুল ভবনটি বানের জলে ভেসে গেছে। তিন দিন পর দক্ষিণ অঞ্চলের একটি জেলা থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়, তবে দুর্গম যোগাযোগের কারণে সেখানে গিয়ে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাননি এই মা।

গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যাটি আঘাত হানে সকালের দিকে, ঠিক যখন শিক্ষার্থীরা স্কুলে পৌঁছাচ্ছিল। স্থানীয় বাসিন্দা অস্ত মান ডাংগোল জানান, উদ্ধার হওয়া কিছু শিশুর শরীরে তখনো স্কুলের লোগোসহ টাই পরা ছিল। তিনি বলেন, বয়সে বড় শিক্ষার্থীরা দ্রুত পাহাড়ের ওপরের দিকে দৌড়ে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিল, কিন্তু শিশুশিক্ষার্থীরা দ্রুত দৌড়াতে না পেরে পানির স্রোতে ভেসে গেছে।

যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ জোরদার

নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই বন্যার পর সামগ্রিক পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে প্রায় ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন (৪৭৭ কোটি) মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। বন্যায় প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং সাড়ে সাত হাজারের বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বর্তমানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকাগুলোর সড়ক এবং সেতু পুনর্নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

প্রকৌশলী ইশমিতা শাহ জানান, বন্যার দ্বিতীয় দিন থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা সচল করতে নেপাল সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রকৌশলী দলগুলো দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে অস্থায়ী বেইলি ব্রিজ তৈরি করা হচ্ছে। তবে আগামী দিনগুলোতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় উদ্ধার ও পুনর্নির্মাণকাজ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে জানান তিনি।

তথ্যসূত্র: এপি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত