Ajker Patrika

খুশির চোটে মরতে বসেছেন নারী, বিরল সমস্যার সন্ধান পেলেন চিকিৎসকেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
খুশির চোটে মরতে বসেছেন নারী, বিরল সমস্যার সন্ধান পেলেন চিকিৎসকেরা
মেয়ের বিয়ের খুশিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন নারী। ছবি: জেমিনি এআই

খুশিতে মরেই যাব— এমন অনুভূতি কার না হয়! কিন্তু সত্যি সত্যি তো খুশিতে আমরা মরতে বসি না। কিন্তু এক নারী বাস্তবেই খুশিতে মরতে বসেছিলেন! নিতে হয়েছিল হাসপাতালে।

৬৫ বছর বয়সী এক নারী তাঁর মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এতটাই আনন্দিত ছিলেন যে তাঁর বুকে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।

‘অক্সফোর্ড মেডিকেল কেস রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে তাঁর এই অবস্থার কথা তুলে ধরে এই বিরল সমস্যার কথা প্রকাশ করা হয়।

অত্যধিক খুশিতে তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে বিয়ের উৎসব শেষ হওয়ার পর টানা তিন দিন ধরে তিনি বুকে ব্যথা এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন।

কেস স্টাডির লেখকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে বুকের ব্যথার কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন ওই নারী। কয়েক মাস আগেও তিনি একই ধরনের ব্যথা অনুভব করেছিলেন। এরপর তাঁকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পাঠানো হয়।

কিন্তু তাঁর পরীক্ষার ফলাফল দেখে চিকিৎসকেরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে রক্তপ্রবাহ কমে গেছে, যা সাধারণত রক্ত জমাট বাঁধার কারণে হয়ে থাকে।

কিন্তু তেমন কোনো ব্লকেজ বা রক্ত জমাট বাঁধার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বরং দেখা যায়, তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের বাম নিলয় (লেফট ভেন্ট্রিকল) অস্বাভাবিকভাবে ফুলে বেলুনের মতো আকৃতি ধারণ করেছে। এর ফলে হৃদ্‌যন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সারা শরীরে কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যায়।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এটি তীব্র ও আকস্মিক আনন্দের একটি লক্ষণ।

কেউ যদি খুব অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত সুখ বা ইতিবাচক আবেগে ভেসে যান, তবে সেই তীব্র আবেগ হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি এতে হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাভাবিক আকৃতিও বদলে যেতে পারে।

এই অদ্ভুত সিনড্রোমের নাম ‘টাকোৎসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ (টিটিএস)। এটি একটি বিরল এবং সচরাচর অবহেলিত স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যার লক্ষণগুলো হুবহু তীব্র মাইয়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন বা হার্ট অ্যাটাকের মতো।

যদিও এটি নিরাময়যোগ্য, তবুও এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ, এই পরিস্থিতি জীবন সংশয়ের কারণ হতে পারে।

টিটিএস সাধারণত অত্যন্ত তীব্র আবেগজনিত ঘটনার কারণে দেখা দেয়। সেই আবেগ ইতিবাচকও হতে পারে, যেমন বিয়ের অনুষ্ঠান; আবার নেতিবাচকও হতে পারে, যেমন সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া।

এর নেতিবাচক রূপটি ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ বা ভাঙা হৃদয়ের সিনড্রোম নামে বেশি পরিচিত। তবে মুদ্রার অপর পিঠের নাম ‘হ্যাপি হার্ট সিনড্রোম’ বা সুখী হৃদয়ের সিনড্রোম, যা তীব্র ইতিবাচক আবেগের আধিক্যের কারণে ঘটে থাকে।

‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ সম্পর্কে মানুষ বেশি জানে কারণ এটি নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি গবেষণা হয়েছে। তবে এটিও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে এখনো অনেকটাই রহস্যময়। এটিও নিরাময়যোগ্য হলেও, কিন্তু একে নিরীহ বলা যায় না।

গবেষণা বলছে, যেসব রোগীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়, কিন্তু লেফট ভেন্ট্রিকলে রক্ত জমাট বাঁধার কোনো লক্ষণ থাকে না, তাঁদের আনুমানিক ১ থেকে ৩ শতাংশ আসলে টিটিএস-এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

শতকরা এই হিসাবটি খুবই কম। আর হ্যাপি হার্ট সিনড্রোমের ক্ষেত্রে এই হার আরও অনেক কম। টিটিএসের যত ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে, তার মাত্র ৪ শতাংশের মতো ইতিবাচক আবেগের কারণে ঘটে থাকে।

তবে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা এতই কম যে, বাস্তবেও এটি এত বিরল কি না, নাকি চিকিৎসকদের নজর এড়িয়ে যাওয়ার কারণে কম শনাক্ত হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

টিটিএস প্রথম নথিভুক্ত হয় ১৯৮৩ সালে জাপানের হিরোশিমা সিটি হাসপাতালে। রোগটির নামকরণ করা হয়েছে জাপানের ঐতিহ্যবাহী অক্টোপাস ধরার ফাঁদ ‘টাকোৎসুবো’-এর নাম অনুসারে। কারণ, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হৃদ্‌যন্ত্রের বাম নিলয় অস্বাভাবিকভাবে যে আকৃতি ধারণ করে, তা দেখতে ওই মাটির পাত্রের মতো।

টিটিএস কেন হয়, এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষকদের ধারণা, ‘হ্যাপি হার্ট সিনড্রোম’ ও ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’—দুই ক্ষেত্রেই হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর প্রভাব পড়লেও তার ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

কেস স্টাডির লেখকেরা বলেন, ‘উভয় অবস্থাতেই সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ক্যাটেকোলামিন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। তবে আবেগ ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক, তার ওপর নির্ভর করে নিউরোহরমোনের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।’

তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হ্যাপি হার্ট সিনড্রোম’-এ সাধারণত হৃদ্‌যন্ত্রের বাম নিলয়ের মাঝের অংশ বা নিচের অংশ বেলুনের মতো ফুলে ওঠে। অন্যদিকে ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’-এ এই পরিবর্তনের ধরন ভিন্ন।

গবেষকেরা আরও যোগ করেন, ‘হ্যাপি হার্ট সিনড্রোমের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো তুলনামূলক কম তীব্র হতে পারে এবং স্বল্পমেয়াদি ফলাফল বা আরোগ্য লাভের হার ভালো হতে পারে। তবে এই বিষয়ে আরও বিশদ তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।’

গবেষকদের মতে, ‘হ্যাপি হার্ট সিনড্রোম’-এ উপসর্গ তুলনামূলকভাবে কম তীব্র হতে পারে এবং স্বল্পমেয়াদে রোগীর অবস্থাও অপেক্ষাকৃত ভালো থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন।

যেহেতু লক্ষণগুলো কম তীব্র হয়, তাই অনেক সময় এগুলোকে উপেক্ষা করা হয়; যদিও এর পরিণতি হতে পারে প্রাণঘাতী।

গবেষকদের মতে, চিকিৎসকেরা হয়তো অনেক সময় এটি এড়িয়ে যান যে অতিরিক্ত আনন্দ বা সুখও মানুষের জন্য কতটা মানসিক বা শারীরিক চাপের কারণ হতে পারে।

তাঁরা লিখেছেন, ‘হৃদ্‌রোগের প্রচলিত ঝুঁকিগুলো না থাকলেও রোগীদের ক্ষেত্রে এই সিনড্রোমের বিষয়ে উচ্চ মাত্রার সতর্কতা ও সন্দেহ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।’

আলোচ্য ঘটনার ওই ৬৫ বছর বয়সী নারী অবশ্য স্বস্তির বিষয় হলো, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং বর্তমানে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, ওই নারী ‘আগামী বছরগুলোতে তাঁর অন্য সন্তানদের জীবনের এমন সুখের মুহূর্তগুলোর সাক্ষী হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত